১০ জুন। চকোরী প্রকাশনার ত্রিশ বছর পূর্তি। ১৯৯২ সালের ১০ জুন চকোরী সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে নিরবচ্ছিন্নভাবে ২০০০ সাল পর্যন্ত এর প্রকাশনা অব্যাহত থাকে। অতপর ২০০০ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে এটি দৈনিক হিসেবে প্রকাশ শুরু করে।
পত্রিকার নাম চকোরী কেন হলো তা নিয়ে আমরা ওই সময়ে চকোরীর উদ্বোধনী সংখ্যা কিংবা পরবর্তী কোনো সংখ্যায় লিখেছিলাম। চকরিয়া এবং চকোরী সমার্থক হলেও, আমরা চকরিয়া থেকে চকোরী শব্দটি গ্রহণ করিনি। চকোরী একটি পাখীর নাম। এই পাখীর অস্থিত্ব আছে কিনা জানা যায়না। তবে জ্ঞান জগতে এ পাখীর বিচরণ আছে। চকোরী এমন একটি পাখী যে রাত জেগে জোৎস্না পান করে। অপরদিকে সাংবাদিকরা রাত জেগে কলাম দিয়ে কাগজে যে অনরবত জোৎস্নার বিচ্ছুরণ ঘটায় তা পরদিন গোটা পৃথিবীকে আলোকিত করে। এক্ষেত্রে চকোরী এবং সাংবাদিকতা সমার্থক।
এক্ষণে খুউব মনে পড়ছে, চকরিয়ার মাতামুহুরী ব্রিজের পশ্চিম পাড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় অকাল প্রয়াত চকরিয়ার আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক, চকোরী’র প্রতিষ্ঠাকালীন বার্তা সম্পাদক জনাব মুজিবুল হক চৌধুরীকে। মনে পড়ে চকোরী’র প্রতিষ্ঠাকালীন সহকারি সম্পাদক মরহুম আমানউদ্দিন খান বাবু ভাইকে। এছাড়া স্মরণ করছি, উদ্বোধনী সংখ্যা প্রকাশের প্রাক্কালে মেকআপে সহযোগিতা করে যিনি ঋণী করেছেন শিল্পী সাফায়াত খানকে। বিশেষ করে মুজিব ভাইয়ের অকাল প্রয়াণ হৃদয়ে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে। যে স§ৃতি থেকে এতগুলো বছর পরও বিস্মৃত হওয়া যায়নি। বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি বিশিষ্ট চক্ষু বিশেষজ্ঞ মরহুম ডা. জামালউদ্দিন আহমদ সাহেবকে। যিনি দীর্ঘদিন চকোরীতে উপসম্পাদকীয় লিখে যেমন সমৃদ্ধ করেছেন তেমনি নানা পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে আমাদের উজ্জীবিত রেখেছিলেন। তাঁর কাছে আমরা নানাভাবে ঋণী।
ত্রিশ বছর আগে যখন চকরিয়া থেকে সাপ্তাহিক পত্রিকা চকোরী’র পথ চলা শুরু হয়, তখনও চকরিয়া শহর হয়ে উঠেনি। চকরিয়া সদর ছিল চিরিংগা ইউনিয়নের একটি অংশ। ক্রমবর্ধমান ও দ্রুত বিকাশমান শহর চকরিয়ার প্রধান সড়কটি আজকের দিনের মতো ডিভাইডার দিয়ে পৃথক করা ৩টি সড়কে বিভক্ত ছিলনা। প্রধান সড়কটি ছিলÑ একটি ওয়ানওয়ে ছিল। আর এতে লেগে থাকতো নিত্য যানজট। ট্রাফিক ব্যবস্থা না থাকায় জনজীবন ছিল দুর্বিসহ। টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল পশ্চাদপদ, গ্রাহামবেলীয় যুগের। এক্সচেঞ্জ থেকে লাইন নিয়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার কিংবা দেশের অন্যত্রে যোগাযোগ করতে হতো। ফায়ার সার্ভিস ছিলনা। কোথাও আগুন লাগলে কক্সবাজার শহরের ফায়ারসার্ভিস অফিসে খবর দিলে ওরা ঘন্টা বাজিয়ে অকুস্থলে পৌঁছতে পৌঁছতে ঘটনাস্থল পুড়ে ছাই হয়ে যেত। ফায়ার ফাইটাররা কয়লার উপর পানি ছিটিয়ে চলে যেত। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ডুলাহাজারা, কচ্ছপিয়া, বানিয়ারছড়া ও হারবাং এর পাহাড়ী এলাকায় সড়ক ডাকাতি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ডাকাতের উপদ্রবের কারণে সন্ধ্যার পর মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস চলাচলা একপ্রকার বন্ধ ছিল বলা যায়। নৌপথেও ছিল ডাকাতের দৌরাত্ম্য। চকরিয়ায় ব্যবসা বাণিজ্য বলতে ছিল কয়েকটি মুদি দোকান আর কয়েকটি স্টেশনারী দোকান কেন্দ্রীক। মার্কেট বলতে হাশেম মার্কেট আর নিউ মার্কেট।
একটি পত্রিকা বেঁচে থাকার জন্য বিজ্ঞাপন অপরিহার্য। অথচ বেসরকারি তরফে বিজ্ঞাপন দেওয়ার কোনো প্রতিষ্ঠান তখনো দাঁড়ায়নি। এরপরেও সম্পূর্ণ পাঠকের উপর নির্ভার করে চকোরী এক দুঃসাহসিক যাত্রা শুরু করে। আর এর মালিক, সম্পাদক ও প্রাকাশক হিসেবে সীমাহীন ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাদেরকে। এমনও দিন গেছে, ছেলের জন্য দুধ না কিনে কিংবা বাড়ির অপরিহার্য বাজার বাদ দিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করতে টাকা যোগান দিতে হয়েছে। কখনো কখনো আবার সুদের উপর টাকা নিয়ে পত্রিকার প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে হয়েছে। সৎ সাংবাদিকতার জ¦ালা অনেক। বৈরী পরিস্থিতিতে এখনো পথ চলতে হচ্ছে। কবে সুদিন আসে আমরা কেউ জানিনা। তবে জানি এই পথ চলতে হবে।
১৯৮৫ সালের গোড়ার দিকে পত্রিকার ডিক্লারেশনের জন্য আবেদন করার পর নানা পর্যায় অতিক্রম করে ১৯৯২ সালের মার্চ মাসে জানা গেলো পত্রিকার ডিক্লারেশনের কাজ শেষ। চূড়ান্ত অনুমতি মিলেছে। তারপর শুরু হলো নতুন যুদ্ধ। পত্রিকা প্রকাশের জন্য সংবাদকর্মী দরকার। কোথায় পাই! চকরিয়া কলেজের বাংলা বিষয়ের তৎকালীন প্রভাষক [বর্তমান অধ্যক্ষ ভারপ্রাপ্ত] সহকর্মী পদ্ম লোচন বড়ুয়াকে বলতেই তিনি একপায়ে খাড়া হয়ে গেলেন। তার আগ্রহে কিছুটা সাহস পেলাম। কিন্তু তিনিতো সংবাদকর্মী নন, শিক্ষক। বললাম নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ করুন, রাজী হলেন।
এরপর শরণাপন্ন হলাম জনাব মুজিবুল হক চৌধুরীর। তিনি এর আগে চট্টগ্রামের কয়েকটি আঞ্চলিক পত্রিকায় কাজ করে চকরিয়ার কাকারাস্থ নিজবাড়ীতে অবস্থান করছিলেন। চকরিয়ার আঞ্চলিক ইতিহাসের অন্যতম গবেষক মুজিবুল হক চৌধুরীকে আমাদের উদ্যোগের কথা জানাতেই তিনিও আনন্দে সায় দিলেন। তিনি বললেন, চিন্তার কোনো কারণ নেই, পত্রিকা বের হবে। তিনি বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব নিলেন। তার সাথে এলেন কাকারার বেদারুল আজিজ চৌধুরী। তিনি বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। যদিও কখনো তিনি পত্রিকার জন্য কোনো বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করেননি তথাপি তার উপস্থিতি ছিল উৎসাহব্যঞ্জক। হারবাং এর আমানউদ্দিন খান বাবু ভাই ছিলেন আমাদের সকলের বয়োজেষ্ট্য। খবর নিয়ে তিনিও এসে যুক্ত হলেন। তিনি ওই সময় সাহারবিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। তিনি দায়িত্ব নিলেন সহকারী সম্পাদকের।
পত্রিকার জন্য সমস্ত লেখা রেডি করে আমরা ৫ জন ১৯৯২ সালের জুন মাসের ৭ তারিখ রাওয়ানা হলাম চট্টগ্রাম শহরের উদ্দেশ্যে। হাজারীগলির ভেতর কোহিনূর হোটেলের কয়েকটি কক্ষ ভড়া নিয়ে লাগেজ রেখে চলে গেলাম কম্পিউটার কম্পোজ করতে। আন্দরকিল্লাহর মোড়ে সিরাজউদ্ দৌলা রোডের ২য় তলায় ছিল ‘কনফিডেন্স কম্পিউটার’।
সেখান থেকে কম্পোজ শেষ করে ট্রেসিং বের করে সোজা নজির আহমদ চৌধুরী রোডের ফ্রেন্ডস প্রিন্টার্সে। প্রেসের মালিক ফরিদ আহমদ পলাশ। অত্যন্ত সজ্জন লোক। বয়সে আমাদের চেয়ে কিছু কম, তরুণ্যে উজ্জীবিত। তার কয়েকজন কাজিন প্রেসের ব্যবসা ও কাজ দেখাশোনা করতেন। প্রেসের সাথে যুক্ত ছিলেন শিল্পী সফায়াত খান, যিনি সাফা খান হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পত্রিকার মেকআপের ব্যাপারে তিনি নানা পরামর্শ দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন। সাফা খান সদ্য প্রয়াত। প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারণকারী এই মানুষটির সাথে আমাদের হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। তাঁর স্মৃতি থেকে বিস্মৃত হওয়া কিছুটা কঠিন।
টানা দু’রাত কঠিন পরিশ্রম করার পর ১০ জুন’৯২ সন্ধ্যায় ছাপার অক্ষরে পত্রিকা হাতে পেলাম। সম্ভবত কক্সবাজার জেলা থেকে কম্পিউটার কম্পোজ করে অফসেট প্রেস থেকে প্রকাশ প্রথম পত্রিকা চকোরী। এ সময় জেলা সদর থেকে লেটার প্রেসে মুদ্রিত দৈনিক পত্রিকা ছিল দৈনিক কক্সবাজার ও সৈকত। অন্য পত্রিকা থাকলেও তা আমাদের চোখে পড়েনি।
চকোরী পত্রিকা নিয়ে চকরিয়া পৌঁছতে পৌঁছতে রাত হয়ে গেলো। একটি গ্রামকে আলোকিত করার জন্য একটি সংবাদ মাধ্যম কিভাবে জনমত গঠন করতে পারে চকোরী তার অনন্য দৃষ্টান্ত। চকরিয়া পৌরসভা গঠন, চকরয়িায় ফায়ার সার্ভিস স্থাপন, চকরিয়ায় ডিজিটাল টেলিফোন একচেঞ্জ স্থাপন, ডাকাতি বন্ধে হাইওয়ে ও নৌ পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন ইত্যাদি বাস্তবায়নে চকোরী দুহাতে কলম চালিয়েছে। যা আজকের দিনের বাস্তবতা।
চকোরী প্রকাশের ত্রিশ বছর পূর্তিতে আমাদের অগুণিত পাঠক, শুভাকাক্সক্ষী, শুভানুধ্যায়ী, বিজ্ঞাপনদাতা, সংবাদসেবী ও সংবাদকর্মীদের পত্রিকার জন্মদিনে জনাই আন্তরিক অভিনন্দন।







