ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের পাশের সড়ক দ্বীপে ” সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতি স্হাপনা” টি অনেকেই দেখেছেন
এই স্হাপনাটিতে যেই গাড়ীটি দেখছেন সেটা ছায়াছবি নির্মাতা তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীর সহ ৫ জন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়া সেই দুর্ঘটনা কবলিত বিধ্বস্ত মাইক্রোবাসটির ধ্বংসাবিশেষ।সাদা রং এর প্রলেপ লাগিয়ে তৈরী হয়েছে এই স্মৃতি স্মারক।
এবার শুনুন অল্পতে ফুরিয়ে যাওয়া গল্পটি…
১৯৮৬ সালে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বাবার একুশ বছরের তরুণী কণ্যা ক্যাথরিন বাংলাদেশে এসেছিলেন নিজের পিএইচডি ডিগ্রির একটা কোর্স করার জন্য। ক্যাথরিনের সাবজেক্ট ছিলো… ডেভেলপমেন্ট ইকোনমি।
এক বছরের জন্য উন্নয়নশীল কোন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে থিসিস করতে হবে, সেদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং গতিপ্রকৃতি নিয়ে। ক্যাথরিন বেছে নিলেন বাংলাদেশকে।তাই আমেরিকার শিকাগো শহর ছেড়ে চলে এলেন বাংলাদেশে।
বাংলাদেশে আসার পরে ঘটনাক্রমে আহমেদ ছফার সঙ্গে পরিচয় হলো ক্যাথরিনের।
আহমদ ছফা একদিন ক্যাথরিনকে পরিচয় করিয়ে দিলেন ফিল্ম মেকার তারেক মাসুদের সাথে।
ছোটবেলা থেকেই চিত্রাঙ্কনের প্রতি ক্যাথরিনের ঝোঁক ছিল। নিজেও আঁকাআঁকি করতেন। তারেক মাসুদ তখন কিংবদন্তী চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ওপর “আদম সুরত” নামে একটা ডকুমেন্টরি বানানোর জন্য ঢাকা – নড়াইল ছুটাছুটি করছিলেন।
তারেক মাসুদ ঢাকায় এলে তার সঙ্গে দেখা হয় ক্যাথরিনের, রাত বাড়ে, আড্ডা জমে। তারেকের সাথে আদম সুরতের সাবটাইটেলের কাজে যুক্ত হলো ক্যাথরিনা।
কাজ করতে করতেই দু’জন দু’ জনার হয়ে যান।
১৯৮৮ সালে তারেক – ক্যাথরিনা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
পরের দুই যুগ এই দম্পতি এক সাথে ডকুমেন্টরি বানিয়েছেন, সিনেমা বানিয়েছেন, গল্পের জন্য, শুটিং স্পট খোঁজার জন্য ঘুরেছেন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। পরিচয় হয়েছে তারেকের অন্যান্য নির্মাতা এবং কলাকূশলী বন্ধুদের সঙ্গে।
যোগাযোগের প্রয়োজনে নিজ তাগিদেই বাংলা ভাষাটা রপ্ত করেছেন ক্যথেরিন, যাতে তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কেউ বিড়ম্বনায় না পড়ে।
ক্যাথরিন মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। তারেক মাসুদের সাথে পরিচয়ের পরেই বাঙালীর স্বাধীনতা সংগ্রামের এই গৌরবের অধ্যায়টা সম্পর্কে জেনেছেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তারেক মাসুদের বয়স ছিল কম, যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি তিনি। পরিণত বয়সে তাই তিনি ক্যামেরা নিয়ে যুদ্ধ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধকে নিজের আঙ্গিকে ফুটিয়ে তুলেছেন সেলুলয়েডে। তারেকের সঙ্গে থাকতে থাকতে, “মুক্তির গান”, “মুক্তির কথা” বা “মাটির ময়না” য় কাজ করতে করতে মুক্তিযুদ্ধ কে হৃদয়ে ধারণ করেন ক্যাথরিন।
২০১১ সালের ১৩ আগস্ট।”কাগজের ফুল” সিনেমার শুটিং স্পট দেখতে মানিকগঞ্জ গিয়েছিলেন সবাই। ফেরার পথে তাদের মাইক্রোবাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলো একটা বাসের সঙ্গে। তারেক মাসুদ ,মিশুক মুনীর সহ ৫ জন মাইক্রোবাস যাত্রী মারা গেলেন।
অমানিশার নিকষ কালো অন্ধকার নেমে এলো ক্যাথরিনের জীবনে। হাসপাতালে যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন জানতে পারলেন তার ভালোবাসার মানুষটা আর নেই, মারা গেছেন তারেক মাসুদ। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ফিরে এলেন ক্যাথরিন, ছোট্ট বাচ্চাটার জন্য তাকে যে বেঁচে থাকতেই হতো!
কস্ট,শূণ্যতা,যন্ত্রণা আর এক বুক হাহাকার নিয়ে ক্যাথরিন সন্তান নিয়ে এখন আমেরিকায় থাকেন।তবে নিয়ম করে তিনি প্রতি বছর বাংলাদেশে আসেন। নিয়তি তার কাছ থেকে প্রিয় মানুষটাকে কেড়ে নিলে ও স্মৃতিটুকু তার কেড়ে নিতে পারেনি।
রাজধানী অলি- গলি- প্রান্তরে, সারা দেশের আনাচে কানাচে তারেকের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। বাংলাদেশে এসে ক্যাথরিন সেসব জায়গায় যান, বন্ধুদের আড্ডায় যোগ দেন। তারেকের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান।
একজন বিদেশী নারী ভালবেসেছেন,হারিয়েছেন,প্রতি বছর আসছেন স্মৃতি মধুর সেই দিন গুলি খুঁজে ফিরছেন প্রিয় মানুষের দেশ …..বাংলাদেশে।
ছবি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নির্মিত ” সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতি স্হাপনা” যা নির্মিত হয়েছে সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত মাইক্রোবাসটি দিয়ে।







