২৫ আগস্ট নীরবে নিভৃতে চলে গেলো মুক্তিযোদ্ধা ধনঞ্জয় ধর এর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলীকদম উপজেলার অবহেলিত একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এ উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চেতনাধারী কেউ তাঁকে স্মরণ করলো না!
ধনঞ্জয় ধরের দুর্ভাগ্য ছিলো যে জীবদ্দশায় তিনি নিজ প্রাপ্য সম্মানটুকু নিয়ে যেতে পারেননি। ২০১৫ সালের ২৫ আগস্ট যখন ৮০ বছর বয়সে ধুঁকে ধুঁকে রোগভোগ করে মৃত্যু হয় তাঁর তখন মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মানটুকু প্রদান করা হবে কিনা তা নিয়েও দেখা যায় নানান টালবাহান।
অনেক দেন দরবারের পর অবশেষে তাঁর লাশকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হয়েছিল! এরপর আর তার পরিবারের খোঁজ আর কেউ নেয়নি। সে সময় এ প্রতিবেদক “স্বীকৃতি পেল না জীবদ্দশায়, মৃত্যুই এনে দিলো তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান!” শীর্ষক একটি সংবাদ ভাষ্য লিখেছিলেন।
ধনঞ্জয় ধর (৮০)। একজন অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধার ছিলেন। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা সদরেই ছিল তাঁর বসবাস। বিগত ২৫ আগস্ট, ২০১৫ খ্রিঃ এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে যান।
মারা যাওয়ার আগে তাঁর ইচ্ছা ছিল মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার। কিন্তু বিধি বাম! জীবদ্দশায় তাঁর কপালে জুটেনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
মারা যাওয়ার পর শুরু হয় তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হবে কিনা। তৎসময়ে আলীকদমে জীবিত ক’জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যেও দেখা যায় বিতণ্ডা! এরমধ্যে একজন সর্তীর্থের লাশের রাষ্ট্রীয় সম্মানের বিপক্ষে অবস্থান নেন! কারণ ধনঞ্জয়ের নাকি সনদ তিনি দেখতে পাননি!
অবশেষে অনেক দেন দরবার শেষে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হলো। মরণের পর ধনঞ্জয়ের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়! কারণ জীবদ্দশায় যাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া হলো না, মরণের পর তার লাশকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল।
জীবদ্দশায় ধনঞ্জয় ধর দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের তালিকাভূক্ত হতে পারেন নি। এ নিয়ে তাঁর আক্ষেপের কমতি ছিল না।
২০১১ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা ধনঞ্জয় ধরের মুখোমুখি হয়েছিলেন এ প্রতিবেদক। সে সময় তিনি যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধোত্তর তাঁর স্মৃতিকথা জানান প্রতিবেদককে। তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই-
“মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি সংসারের মায়া ত্যাগ করে জীবনবাজি রেখে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য ভারতের সাবরুম-হরিণা ক্যাম্পে চলে যাই। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরত এসে যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আমার মতো অনেকের ত্যাগে ও কষ্টে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণপণ লড়লেও শেষ বয়সে এসে আমার জীবন কাটছে অর্ধাহারে অনাহারে!
মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম তুলতে অনেকবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ‘সনদ’ পাইনি। নানান জনের কাছে গিয়েছি। সকলে আশ্বাস দিয়েছেন বটে। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। আমি দুর্ভাগা; নইলে স্বাধীনতার এতবছর পরও তালিকায় নাম ওঠেনি কেন!
ধনঞ্জয় ধর জানিয়েছিলেন, “যুদ্ধকালীন সময়ে আমার গ্রামের বাড়ি ছিলো কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার দিগরপানখালী গ্রামে। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধু খুন হবার খবর শুনেই পরদিন ১৬ আগস্ট আমি স্বপরিবারে পাহাড়ি এলাকা আলীকদমে চলে আসি।
স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও আমার জীবনের নৌকার পালে হাওয়া লাগেনি! আমার এখন পড়ন্ত বেলা। এ বয়সেও যখন মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলাম না তখন মরণই একমাত্র গতি!”
আমি মুক্তিযোদ্ধা ধনঞ্জয়ের শেষোক্ত আক্ষেপ “মরণই একমাত্র গতি!” একথার প্রতিফলন দেখে অশ্রুসিক্ত হয়েছিলাম ২০১৫ সালে ২৫ আগস্ট। ঠিকই দেখলাম অনেক প্রশাসনিক দেন দরবার শেষে তার লাশকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দানের তোড়জোত শুরু হয়। আলীকদম উপজেলার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ইউএনও খালেদ মাহমুদ মুক্তিযোদ্ধা ধনঞ্জয় ধর এর লাশকে গার্ড অব অনার দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন।
এ সময় উপিস্থিত ছিলেন আলীকদম থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আসলাম হোসেন, লামা প্রেসক্লাবের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা প্রিয়দর্শী বড়ুয়া, মুক্তিযোদ্ধা মহসিন সর্দার, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান, থানার সেকেন্ড অফিসার মোঃ মহিউদ্দিন, আওয়ামী লীগ নেতা সমরঞ্জন বড়ুয়া, মাস্টার মহিউদ্দিন, যুদ্ধমনি তঞ্চঙ্গ্যাসহ আলীকদমের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
২০১১ সালে মুক্তিযোদ্ধা ধনঞ্জয় খুব কাতরসরে বলেছিলেন, বাবা আমার একটা সাক্ষাৎকার তুমি পত্রিকায় ছাপাও। দেখি সরকার কিছু করে কি না! তাঁর এ কাতর মিনতি আমাকে আলোড়িত করেছিল। আলীকদম প্রেসক্লাবে বসে আমি মুক্তিযোদ্ধা ধনঞ্জয়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা মোহসিন সর্দার। কয়েক বছর আগে তিনিও মারা গেছেন।
সাক্ষাৎকারকারে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের স্মৃতিচারণ করে ধনঞ্জয় ধর জানান, “চকরিয়ার তেজেন্দ্র দে, নুর মোহাম্মদ, পুলিন শর্মা ও সন্দিপের শামশু কমাণ্ডারসহ আমরা ৩২ জনের একদল যুবক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের লোহারবন ১নং সেক্টরের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যাই।
৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে ভারতের হরিণা ক্যাম্প থেকে অস্ত্র নিয়ে আমরা ৩২ জন মুক্তিযোদ্ধা রামগড় বর্ডার দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ি। রাঙ্গুনিয়া এলাকায় হানাদার বাহিনীর হাতে আমি ধরা পড়েছিলাম। তবে কৌশলে পালিয়ে আসতে সক্ষম হই।
পালিয়ে এসে সাতকানিয়ার পুটিবিলায় যুদ্ধকালীন ক্যাম্পে যোগ দেই। ওই সময় আমরা সাতকানিয়া থানায় হামালা চালিয়ে কিছু গোলাবারুদ সংগ্রহ করি”।
ধনঞ্জয় ধর আরো জানান, “আজিজনগর এলাকা থেকে ১৮ জন পাঞ্জাবী সৈন্যকে ধরে পুটিবিলা ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে আমরা হত্যা হত্যা করি”।
তৎসময়ে তাঁর দেওয়ার বর্ণনার সঠিকতা নিরূপনে আমি চকরিয়ার ঘুনিয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা জেডএ দিদারুল ইসলাম এর সাথে আলাপ করি। তিনি এ সত্যতা জানিয়েছিলেন আমাকে।
মুক্তিযোদ্ধা দিদারুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনিও সাতকানিয়া থানা আক্রমণে অংশ নেন। এ আক্রমণে সন্দিপের কমান্ডার শামশু বিএসসি, উখিয়ার আইয়ুব বাঙ্গালী এবং ধনঞ্জয় ধরসহ অনেকে ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধার গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন সন্দিপের শামশু বিএসসি। এ গ্রুপে মুক্তিযোদ্ধা ধনঞ্জয়সহ ৪ জন ছিলেন চকরিয়ার বাসিন্দা’।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে ধনঞ্জয় ধরকে জিজ্ঞাসা করি, ‘কেন আপনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সে সময় তালিকাভূক্ত হতে পারেন নি?’
উত্তরে ধনঞ্জয় ধর বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পরপরই পর্বতময় এলাকা আলীকদমে চলে আসি। আমার পিতা গরীব ছিল। তাই পড়ালেখা করতে পারিনি। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সনদ নিতে হবে সে ধারণা আমার ছিল না। স্বাধীনতার পর সরকারের আদেশে অস্ত্র জমা দিয়েছি। কিন্তু তালিকায় নাম উঠাতে হবে ভাবিনি”।
ধনঞ্জয় ধর আরো জানান, “মুক্তিযুদ্ধের পর চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী ক্যাম্পে অস্ত্র জমা দিই। এ সময় মুক্তিযোদ্ধের সর্বাধিনায়ক মুহাম্মদ আতাউল গনী ওসমানী’র নামাঙ্কিত ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র’ নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। আমার সনদপত্র নং- এন-৩০৪৯২।”
ধনঞ্জয় ধর তাঁর সনদটি এ প্রতিবেদককে দেখান। সনদে উল্লেখ আছে, “তিনি ১নং সেক্টরে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর অবদান চির উজ্জ্বল হয়ে রইবে”।
এ সাক্ষাৎকার গ্রহণের পর এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয়, চকরিয়ার মুক্তিযোদ্ধা (বর্তমানে প্রয়াত) আনোয়ার হোসেন বাঙ্গালীর সাথে। তিনি জানান, “ধনঞ্জয় একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধকালীন সময়ে আমার সহযোদ্ধা হিসেবে ধনঞ্জয় ধর ছিলেন”।
তাঁর সাক্ষাত নেওয়ার সময় এ প্রতিবেদক লক্ষ্য করেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ী হলেও জীবনযুদ্ধে পরাজিত ধনঞ্জয় ধরের আক্ষেপের কমতি ছিল না। তিনি জানিয়েছিলেন, “আমি আনুমানিক ১০ শতক জমিতে ঘর করেছি। তবে এ জমি আমার নামে এখনো সরকারী রেকর্ডভূক্ত হয়নি। আমার ২ মেয়ে ৪ ছেলে এবং স্ত্রীকে নিয়ে সংসার। ২ মেয়েকে পাত্রস্থ করেছি। ২ ছেলেও বিয়ে করেছে। আমার বয়স এখন ৭৬। হাঁপানীসহ বার্ধক্যজনিত অসুখে ভূগছি আমি। বর্তমানে আমার কোন আয় নেই। ছোট দু’ছেলের আয়ের ওপর দুঃখ কষ্টে দিন কাটে আমার”।
২০১১ সালের ২৪ ডিসেম্বর বিকেল। মুক্তিযোদ্ধা ধনঞ্জয় ধরের সাথে আলাপচারিতা শেষ করবো। এ সময় আমি একবাক্যে তার শেষকথা জানতে চাই।
তখন মুক্তিযোদ্ধা ধনঞ্জয় ধর আক্ষেপের সুরে বললেন, “দাদু, জীবনযুদ্ধে পরাজিত হতে চললেও দেশমাতৃকার যুদ্ধে আমি বিজয়ী বীর। যুদ্ধ করেছি তাই স্বীকৃতি চাই”।
ধনঞ্জয় ধর বেঁচে থাকতে হয়তো সরকারী তালিকায় মুক্তিযাদ্ধা হিসেবে নাম উঠাতে পারেন নি! তবে পুরো আলীকদম উপজেলায় তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিতে দলমত নির্বিশেষে কারো দ্বিমত ছিল না।
“যুদ্ধ করেছি তাই স্বীকৃতি চাই”- তাঁর এ ইচ্ছা মরণেই পূর্ণ হয়েছিল। যখন এতে তার কিছু যায় আসেনি!
মৃত্যুর পর তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাহ করতে স্থানীয় প্রশাসন উদ্যোগ নিয়েছিল। তাঁর লাশের কফিনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খালেদ মাহমুদ বলেন, ‘যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি পতাকা, চেয়ারে বসে চাকুরী করতে পারছি, কথা বলতে পারছি, সে রকম একজন মুক্তিযোদ্ধা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, এতে কোন দ্বিধাদ্বন্ধ নেই। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের কথা স্বীকার করে ইউএনও বলেন, তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি’।
২৫ আগস্ট, ২০১৫ ইং। বিকাল সাড়ে চারটা। উপজেলা নির্বাহী অফিসার, লামা ও আলীকদমের মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের উপস্থিতিতে পুলিশ ও সেনা সদস্যদের দ্বারা তাঁর কফিনে রাষ্ট্রীয় মর্যদা গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
তারপরও ধনঞ্চয়ের শুভার্থী হিসেবে আমাদের বুক গর্বে সে সময় ফুলে উঠেছিল! কারণ মৃত্যুর পর হলেও একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে সরকার সম্মান জানিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর ৭ বছর পর আবারো তাঁকে স্মরণ করলাম। পরপারে ভালো থাকুন প্রিয় মুক্তিযোদ্ধা ধনঞ্জয় ধর!
লেখক- মমতাজ উদ্দিন আহমদ, সভাপতি, আলীকদম প্রেস ক্লাব।
তারিখ : ২৬ আগস্ট, ২০২২ খ্রিঃ।







