সরকারের টেকসই পরিকল্পনায় কৃষিকে যান্ত্রিকীরণের আওতায় চালু করা যন্ত্রের সাহায্যে ধান রোপণ তথা রাইস ট্রান্সপ্লান্ট’ পদ্ধতির চাষ চকরিয়া উপজেলার কৃষকের মাঝে ইতোমধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। গত দুইবছর পরীক্ষামূলক ভাবে রাইস ট্রান্সপ্লান্টের’ পদ্ধতিতে ধান রোপন শুরু করা হলেও মাত্র একবছরের মধ্যে উপজেলার কৃষককুলে ডিজিটাল প্রযুক্তির এই চাষাবাদ অভাবনীয় সাড়া ফেলেছে।
ডিজিটাল উদ্ভাবনী এ যন্ত্রের সাহায্যে সমগভীরতায়, সম দূরত্বে এবং অল্প শ্রমে জমিতে ধানের চারা রোপন করা সম্ভব হচ্ছে। এতে সময় লাগছে কম, চাষের খরচও পড়ছে তুলনামূলক অনেক কম। আবার জমিতে সমগভীরতায় ধান রোপনে বাড়বে ফলনও এমন অভিমত জানালেন কৃষক ও কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা।
মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাইস ট্রান্সপ্লান্ট পদ্ধতিতে ধান রোপন করতে আগে বীজতলা তৈরির দরকার হয়না। বাড়তি ঝামেলা হয় না ঝর-বৃষ্টিতে। চারা রোপনে শ্রমিক মুজুরির তুলনায় খরচও কম। রোপনে সময়ও লাগে অল্পদিন। আর এসব সুফলের কারণে বর্তমানে চকরিয়া উপজেলার বেশিরভাগ কৃষক ধানের চারা রোপনে এ যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। তাঁরা বলছেন এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে লোকসান আর গুনতে হবে না। বরং চাষাবাদে দেখা যাবে লাভের মুখ।
চকরিয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি অফিসার (উন্নয়ন শাখা) রাজীব দে বলেন, চকরিয়া উপজেলার ১৮ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় চলতি বোরো মৌসুমে ৪৪ হাজার পাঁচশত একর জমিতে বোরো চাষাবাদ করা হচ্ছে। তদমধ্যে এবছর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ৪৮০ একর (১২০০ কানি) জমিতে রাইস ট্রান্সপ্লান্ট পদ্ধতিতে ধান রোপন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলার ডুলাহাজারা ও পুর্ববড় ভেওলা ইউনিয়নে সবচে বেশি জমিতে রাইস ট্রান্সপ্লান্ট পদ্ধতিতে ধান রোপন করা হয়েছে। এছাড়া অপরাপর ইউনিয়নে কিছু কিছু জমিতে হয়েছে এই পদ্ধতিতে ধান রোপন। এখন বেশিরভাগ কৃষক এই পদ্ধতির চাষাবাদে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন।
জানতে চাইলে ডুলাহাজারা ইউনিয়নের উলুবনিয়া এলাকার কৃষক আবদুল মতলব বলেন, ‘ এককানি জমিতে বীজতলা থেকে ধানের চারা উঠানো এবং জমিতে চারা রোপণ করা পর্যন্ত কমপক্ষে পাঁচজন শ্রমিক লাগে। তাঁদের পারিশ্রমিক দিতে হয় ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা। আর রাইস ট্রান্সপ্লান্টের মাধ্যমে প্রতি কানি জমিতে ধানের চারা রোপন করতে পেট্রোল লাগে পাঁচশ মিলি লিটার। যার বর্তমান বাজার মূল্য মাত্র ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। আর সময় লাগে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫ মিনিট। তাই সবকিছু বিবেচনা করে আমি এ যন্ত্র দিয়ে ধান রোপন করেছি।
তিনি বলেন, চাষের শুরুতে রাইস ট্রান্সপ্লান্ট মেশিন নিয়ে আমাদের মাঝে ভুল ধারণা ছিলো। পরে উপজেলা কৃষি অফিসার ও ব্লকের উপসহকারী কৃষি অফিসারের নিয়মিত পরামর্শ দিকনির্দেশনায় সেটি কেটে গেছে। এখন নিজেই ট্রেতে বীজ বপন এবং জমিতে মেশিনের সাহার্যে চারা রোপন করতে পারি।
চকরিয়া পুর্ববড় ভেওলা ইউনিয়নের মাইজপাড়া এলাকার কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, রাইস ট্রান্সপ্লান্ট পদ্ধতিতে জমিতে বীজতলা তৈরি করতে হয়না। ধানের বীজ চারা হয় ট্রেতে। প্রথমে ট্রেতে এক ইঞ্চি পরিমাণ ঝড়-ঝড়ে মাটি দিতে হবে। ধানের বীজ ফেলতে হবে ওই মাটির উপর। এরপর ওই ধানের বীজের উপর আবারও এক ইঞ্চি পরিমাণ ঝড়-ঝড়ে মাটি দিয়ে বীজগুলো ঢেকে রাখতে হবে। তারপর সেখানে পানি স্প্রে করতে হয়। এভাবে ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে চারা রোপনে উপযোগী হয়ে উঠে। এরপর জমিতে ওই মেশিন দিয়ে চারা রোপন করতে হয়।’
চকরিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ এসএম নাছিম হোসেন বলেন, সরকার কৃষিকে যান্ত্রিকীরণের আওতায় নিয়ে আসায় চাষাবাদে এখন শ্রমিক ও মজুর সংকট লাগব হচ্ছে। চাষে অতিরিক্ত খরচও সাশ্রয় হচ্ছে। এছাড়া রাইস ট্রান্সপ্লান্ট পদ্ধতিতে চাষাবাদে অনেকগুলো সুবিধা আছে।
সুবিধাগুলো হচ্ছে, ট্রেতে করে বীজ উৎপাদন করায় ধানের চারার শিকড় ছেড়ে না। সে কারণে অল্প সময়ে মাটির সঙ্গে লেগে যায়।
যেখানে সনাতন পদ্ধতিতে ৪ গুন বেশি জায়গা লাগে বীজতলা তৈরির জন্য। সেখানে ট্রেতে করে উৎপাদন করতে জায়গা লাগে অনেক কম। আবার ঝড়-বৃষ্টি বা যে কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগে দ্রুত সময়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া যায়। এই প্রযুক্তি ব্যবহারে জমিতে তুলনামূলক ফলনও বেশি হয়। ১০ থেকে ১৫ দিন আগেই ধান কাটার উপযোগী হয়ে উঠে।
তিনি বলেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরন প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৩৫ জন কৃষকের মাঝে ৭০ শতাংশ সরকারি ভুতকির টাকায় এসব রাইস ট্রান্সপ্লান্টার যন্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। এই যন্ত্রের সাহায্যে জমিতে সমগভীরতায়, সম দূরত্বে এবং অল্প শ্রমে কৃষকরা ধানের চারা রোপন করছেন। এতে সময় কম লাগছে। কম খরচে চাষ করে জমিতে ফলন পাবে বেশি। বরং রাইস ট্রান্সপ্লান্ট পদ্ধতিতে চাষ করে ধান উৎপাদনে কৃষকদের লোকসান গুনতে হবে না বলে আমরা আশাবাদি।
চকো/জে







