শীতের খুশবু পাচ্ছি উত্তরের হাওয়ায়।
বেলা ১১টার দিকে শীতল একটা অনুভূতি বলে দিলো সে এসেছে।
হেমন্তের দিনগুলো ছোট হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। কদিন পরই কুয়াশায় জড়িয়ে যাবে দিন। আমলকির ডালে ডালে রোদ ঝুলে থাকবে , নরোম আলো।
হেমন্ত এলেই আমার মায়ের সোয়েটার বোনার দৃশ্য মনে পড়ে। শুধু সোয়েটার নয়, মাফলার, টুপি, মোজা।
মা কে মনে পড়লেই সবকিছু ঝাপসা লাগে। মনে হয় কোন সুদূর থেকে কে যেন ডাক পাড়ে।
ডাক দিয়ে বলে ভালো থাকিস।
প্রতি সন্ধ্যায় অজিত এসে ধূপ জ্বালিয়ে দেয়, মশা তাড়ানোর জন্য । তখন আমাদের সন্ধ্যাকালিন চা পর্ব শেষ হয়। কোনা চোখে চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে দেখে। আমি বুঝতে পারি। তার জন্য নির্ধারিত খাবার টা হাতে তুলে দিই। সে খুব খুশি হয়।
সুমেত চাকমা দাদা, সহজ সরল। যখন যা দরকার হয় বিশেষ করে ডাক্তারের সিরিয়াল নিতে সুমেত দাদা একনম্বর। ইঞ্জিনিয়ার শুভাশিস তালুকদার , অসাধারণ, বিনয়ী, স্মাট মানুষ। আমার বাসায় আসলেই গিটার নিয়ে গান ধরেন। বিনয় কুমার , খুব করিৎকর্মা মানুষ। পাতালের ঝিঁঝিঁ পোকা এনে দিতে বললেও নিয়ে আসতে পারবে।
স্মৃতি রানী প্রতিদিন আমার বাসার সামনের কল থেকে কলসি ভরে পানি নিয়ে যায়, অফিসের জন্য। প্রতিদিন জানতে চায়, ম্যাডাম কেমন আছেন? সেই সময়টাতে আমি দোলনায় বসে আকাশের নীল মাপি। পাখিদের ভাষা শিখি।
কে যেন বলে ভালো থাকিস। এই কণ্ঠ আমার চেনা।
তার সাথে আমার সম্পর্ক চির জীবনের। আমি মনে মনে বলি আপনিও ভালো থাকবেন। সেই কণ্ঠ আমাকে টেনে নিয়ে যায় অতীতের দিকে। আমি যেতে যেতে দেখতে পাই, আমাদের চুল কাটার জন্য বসন্তদাদা এসে বসে আছেন। শীতের ভোরে বরদা সুন্দরী গরম জিলিপি আর মুড়ি নিয়ে বসে আছে।
আব্বার সাথে গল্প করছে ডাক্তার পূর্নচন্দ্র দাস।
আমাদের কাছারীঘরে অনিলবাবু স্যার, সজলকান্তি স্যার, কাজল কান্তি স্যার, রসিদ আহমদ স্যার, হাতে বেত নিয়ে বসে আছে। আমাদের শিক্ষক । অনিলবাবু স্যার ১০ বছর এক নাগাড়ে আনাদের কাছারীঘরে ছিলেন। না, কোন স্বার্থের সংঘাত সেখানে নাই। অপূর্ব সহাবস্থানে শিখতে পেরেছি, মানুষই মানুষ ।
হিন্দু পাড়ার লোকেরা আব্বাকে ডাকতেন ‘বাবা ‘. তারা সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতো বলে আব্বা বলতেন
, ওসব করতে নেই। আমি সাধারণ মানুষ। আব্বার কাছে শিখতে পেরেছি , অসাধারণ হয়েও কিভাবে সাধারণ হতে হয়।
শীত আসছে, জানান দিচ্ছে শেষ রাতের ঠান্ডায় ।
শুনতে পাই ” ঠান্ডা লাগাসনে ”
আমি কাঁথা জড়িয়ে তাঁর কণ্ঠ শোনার প্রতীক্ষা করি।
নামাজের সময় কাজা হয়ে যাচ্ছে , ‘উঠিস না কেন’ ?
হ্যা আমরা ছোটকাল থেকে শিখতে পেরেছি , যার যার সম্মান তাকে দিতে হয়।
শীত কিংবা গ্রীষ্ম, শরত কিংবা হেমন্ত,
চাঁদের জল জোছনায় সাঁতার কেটে আমি বারবার চলে যাই অতীতের অতল স্মৃতির কলতানে। আমি জানি সেখানে আমি মানুষ হতে শিখেছিলাম।
ঝিনুক জোবাইদা
.একুশঅক্টোবর’২১







