২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) সারাদেশে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালায়। এই হামলায় কেঁপে ওঠে দেশের ৬৩ জেলা। হামলায় মারা যায় ২জন। আহত হয় শতাধিক। স্বাধীনতার পর দেশের অন্যতম ভয়ানক এ জঙ্গি হামলার দেড় যুগ পূর্ণ হয়েছে বৃহস্পতিবার (১৭ আগস্ট)। হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল, জেএমবির সাংগঠনিক সক্ষমতা জানান দেওয়া এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী গুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ। ১৭ আগস্ট বোমা হামলার পরও বিভিন্ন সময়ে জেএমবি দেশের কোথাওনা কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে বোমা হামলা চালিয়েছে, কিংবা হামলার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাড়াশি তৎপরতায় জেএমবি অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও যে অপচিন্তা ও আদর্শ নিয়ে দলটি গঠিত হয়, সেটি এখনও নির্মূল করা সম্ভব যায়নি। যার ফলশ্রুতিতে জেএমবি ভেঙে গঠিত হওয়া নব্য জেএমবি ২০১৬ সালে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরায় নৃশংস হামলা চালায়।
১৭ আগস্ট’০৫ সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় দেশব্যাপী ১৬১টি মামলা দায়ের হয়। তদন্ত শেষে এই ঘটনার সব মামলার প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ। এসব মামলার মধ্যে ১৪৩টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। বাকি ১৮টি মামলায় ঘটনার সত্যতা থাকলেও আসামি শনাক্ত করতে না পারায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
এই ১৪৩টি চার্জশিটে আসামি করা হয়েছে ১ হাজার ১৫৭ জনকে। যার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ১ হাজার ২৩ জনকে। আসামিদের মধ্যে ৩২২ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। ১৫ জনের ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়েছে। সিরিজ বোমা হামলার সময় জেএমবির প্রধান ছিলেন শায়খ আব্দুর রহমান এবং এর সামরিক শাখার প্রধান ছিলেন সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাই। অন্য একটি মামলায় ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
তাদের ফাঁসির পর জেএমবির আমির হন মাওলানা সাঈদুর রহমান। দ্বিতীয় দফা পুনর্গঠিত হতে থাকে জেএমবি। তবে তিনিও বেশি দিন গ্রেপ্তার এড়িয়ে থাকতে পারেননি।
২০১০ সালের ২৫ মে ঢাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। সাঈদুর রহমান গ্রেপ্তারের ৪ বছর পর ২০১৪ সালে আবারও জোরালোভাবে নিজেদের শক্তি জানান দেয় জেএমবি। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে জঙ্গি ছিনতাই করে তারা। এ সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সালাউদ্দিন সালেহীন ওরফে সানি (৩৮) এবং রাকিবুল হাসান ওরফে হাফেজ মাহমুদ (৩৫) এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আসামি জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজানকে (৩৫) ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
এরপর মতাদর্শগত পার্থক্য ও নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে ২০১৫ সালে জেএমবি থেকে একটি বড় অংশ বেরিয়ে যায় এবং নব্য জেএমবি নামে নতুন সংগঠন তৈরি করে। ফলে সংগঠনটি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। পুরাতন জেএমবি ও নব্য জেএমবি। পুরাতন জেএমবি ছোটখাটো নাশকতা করে সংগঠনটি সচল রাখতে চাইলেও নব্য জেএমবি চুপচাপ তাদের সাংগঠনিক ও আর্থিক শক্তি বাড়ানোর কাজ করতে থাকে। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার মধ্য দিয়ে। হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা করে দেশি-বিদেশি ২০ জনকে হত্যা করা হয়। এর ঠিক সপ্তাহখানেক পর ৭ জুলাই শোলাকিয়ার ঈদগাহে আরও একটি হামলা চালায় নব্য জেএমবি। এসব হামলার দায় আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) স্বীকার করলেও একে ‘নব্য জেএমবি’ বা জেএমবির বিদ্রোহীর অংশগ্রহণ বলে জানান দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা।
এ দুটি জঙ্গি হামলার পর সক্রিয় হয়ে ওঠে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চলতে থাকে রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা জঙ্গি আস্তানার সন্ধান। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার মুখে নব্য জেএমবি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। অভিযানে শীর্ষ জঙ্গিদের অনেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয় কিংবা গ্রেপ্তার হয়।
কিন্তু এদের একেবারে নির্মূল করা গেছে এমনটি ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করার সুযোগ নেই। কারণ এদের বিকাশের উর্বর ভূমি রয়েছে সর্বত্রই। এদেশের মানুষের মন অত্যন্ত সহজ সরল ও নরম। সহজেই বাংলার সহজ সরল সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করা যায়। তাই এই উন্মাদনার বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পাশাপাশি জঙ্গীগোষ্ঠীগুলোকে আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করার কৌশল প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন জরুরী। একটা বিষয় আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যে, কেউ জঙ্গি হয়ে জন্মায়না। ক্ষমতালোভী, সুবিধাবাদী শ্রেণি জল ঘোলা করে সুবিধা আদায়ের জন্য আমাদের কোমলমতি সন্তানদের সামনে টোপ ফেলে জঙ্গি হিসেবে তৈরি করে। যার অনিবার্য পরিণতি ভুক্তভূগী পরিবার সমূহে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতের সৃষ্টি করে।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এদের তৎপরতা হয়তো সাময়িকভাবে হয়তো স্থিমিত হবে, কিন্তু সম্পূর্ণ নির্মূল হবেনা। এদের এই বিপদগামী পথ যে, ধর্মের অপব্যাখ্যার ফলশ্রুতি এবং এটি যে ইসলাম সমর্থন করেনা, তা পরিস্কার করার জন্য ব্যাপক ক্যাম্পেইন অপরিহার্য বলে মনে করি। নইলে জঙ্গী সংগঠনগুলোর অপব্যাখ্যার শিকার হয়ে কোমলমতি উঠতি বয়সের কিশোর-তরুণ-যুবারা বিপথগামী হয়ে নিজেরা যেমন নিজেদের জীবনকে বিপন্ন করবে, তেমনি তাদের পরিবারকে গোটা দেশের কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন করে সামাজিকভাবে নতজানু রাখবে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে জঙ্গী সংগঠনগুলোর অপপ্রচার ও অপতৎপরতার কাউন্টার হিসেবে ব্যাপক ইতিবাচক ক্যাম্পেইন অব্যাহত রাখা জরুরী। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি তরফে বড় প্রকল্প গ্রহণ করে অব্যহত ক্যাম্পেইন প্রোগ্রাম চালু রাখার উপর আমরা গুরুত্বারোপ করতে চাই।







