বিএনপি’র ডাকা তিনদিন অবরোধ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিনেও চট্টগ্রামে নেই যানবাহন ও যাত্রীর চাপ। ছেড়ে যায়নি দূরপাল্লার বাস। গতকাল বুধবার (১ নভেম্বর) সকালে চট্টগ্রাম থেকে দূরপাল্লার কোনও বাস ছেড়ে যায়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। নগরের আন্তঃজেলা টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে বাস ও চেয়ারকোচের সারি।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কুমিল্লাসহ দেশের ১১৭টি রুটে নিয়মিত যানবাহন ছাড়ে। এর মধ্যে ৭-৮টি রুটে যানবাহনের সংখ্যা বেশি। নগরের বিআরটিসি বাস টার্মিনাল, শুভপুর বাস স্ট্যান্ড, কদমতলী বাস স্ট্যান্ড, তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু এলাকা, একে খান মোড়, অলংকার, বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব যানবাহন ছেড়ে যায়নি।
সকাল থেকেই মহাসড়কে যান চলাচল সীমিত ছিল। এর ফলে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য বের হওয়া মানুষদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পাশাপাশি অনেককেই বাসের জন্য মহাসড়কে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। তবে ট্রেন চলাচল করছে। রাস্তায় রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা, মিনিবাস চলাচল করেছে।
চট্টগ্রামে বুধবার সকালে বেশ কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পটিয়ার দিক থেকে আসা কয়েকজন দুর্বৃত্ত বাসে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ সহকারী পরিচালক মো.আবদুর রাজ্জাক জানান, সকাল সোয়া আটটার দিকে দুর্বৃত্তরা একটি লোকাল বাসে আগুন দেয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সেখানে যায়। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জহির হোসেন জানান, গার্মেন্ট শ্রমিকদের নামিয়ে দিয়ে বাসটি কর্ণফুলী থেকে পটিয়ার দিকে যাওয়ার সময় ভেল্লাপাড়া ব্রীজের পাশে অবরোধকারীরা সেটি আটকে আগুন ধরিয়ে দেয়। বাসচালক ও সহকারী দ্রুত নেমে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান। জড়িতদের শনাক্ত করতে অভিযান চলছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে বুধবার ভোরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চন্দ্রঘোনা-কদমতলী ইউনিয়নের চৌধুরী গোট্টা এলাকায় চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে গাছ কেটে ব্যারিকেড দেয় দুর্বৃত্তরা। পরে সেখানে আসা দুটি খালি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গিয়ে আগুন নেভায়।
ফায়ার সার্ভিসের রাঙ্গুনিয়া স্টেশন কর্মকর্তা জাহেদুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রাকের আগুন নেভানো হয়। পরে সড়ক থেকে গাছ কেটে সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।
রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চন্দন কুমার চক্রবর্তী বলেন, এ ঘটনায় থানায় মামলা করা হচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সীতাকুণ্ড এলকায় মালবাহী লরিতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
বুধবার (১ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে শেখপাড়া এলাকায় ঢাকাগামী লাইনে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় লরি চালক আহত হয়েছে।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফায়েল আহমেদ বলেন, মালবাহী লরিতে আগুন দিয়েছেন দুর্বৃত্তরা। আগুনে লরির ক্ষতি হয়েছে। এতে লরি চালকও আহত হয়। জড়িতদের শনাক্ত করতে অভিযান চলছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে ৬ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, আনসার সদস্যের কয়েকটি টিম টহল দিয়েছে। নগরের প্রায় সবকটি পয়েন্টে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।
বিএনপি’র ডাকা টানা তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন গতকাল বুধবার সকালে ঢাকার মুগদা, সাভার এবং চট্টগ্রামে চারটি বাসে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া সিলেটে অবরোধকারীদের সাথে আওয়ামী লীগে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
অপরদিকে বিএনপি তাদের নেতাকর্মী মারা যাওয়ায় সিলেট বিভাগের চার জেলায় এবং কিশোরগঞ্জে অবরোধের পাশাপাশি হরতাল পালন করেছে বিএনপি। এদিকে, প্রথম দিনের মতো অবরোধের দ্বিতীয় দিনেও ঢাকার রাস্তায় প্রায় সব ধরনের গাড়ির সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম দেখা গেছে। ফলে যানজটও তেমন ছিলনা। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বাড়তে দেখা গেছে।
বুধবার সকাল ১১টার দিকে রাজধানী ঢাকার মুগদা আইডিয়াল স্কুলের সামনে অবরোধকারীরা একটি গাড়ি আগুন দেয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মুগদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণ করে। এই ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। এরআগে, বুধবার ভোরে সাভারের মধুমতী মডেল টাউন এলাকায় একটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। বাসটির সহকারী, যিনি ঘটনার সময় বাসের ভেতরেই ঘুমিয়ে ছিলেন, বলেন ভোর ৬টার দিকে একদল লোক এসে প্রথমে বাসের জানালার কাঁচ ভেঙে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এরপর তিনি দ্রুত বাস থেকে বের হয়ে যান। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় বাসের আগুন নেভানো হয়। এ ঘটনার পর ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সকাল ১০টার দিকে বিজিবিকেও ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকায় টহল দিতে দেখা গেছে।
এদিকে বুধবার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে রাজধানীর নতুনবাজার এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে বাসে আগুনের খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার এ তথ্য জানান।
অবরোধের প্রথম দিনে নিহতদেরকে দলীয়কর্মী দাবি করে এর প্রতিবাদে বুধবার কিশোরগঞ্জ এবং সিলেট বিভাগের চার জেলায় হরতাল পালন করেছে বিএনপি।
এর মধ্যে সিলেট শহরে বিএনপি-জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে স্থানীয় প্রতিনিধি জানান, হরতাল-অবরোধের সমর্থনে বুধবার সকালে সিলেট শহরে মিছিল বের করে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা। মিছিলটি বন্দরবাজার এলাকা আসলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ছয় জন আটক করা হয়েছে ।
এছাড়া মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা এবং কিশোরগঞ্জে অর্ধবেলা হরতাল পালনকালে কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং প্রবেশপথগুলোতে র্যাব-পুলিশের সতর্ক অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে।
এছাড়া ঢাকা ও সাভারের কোথাও কোথাও বিজিবি-কেও টহল দিতে দেখা গেছে।
ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোর বিভিন্ন মোড়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গতকাল বুধবার দিনভর অবস্থান নিয়েছিলেন। অনেক জায়গায় অবরোধবিরোধী মিছিল ও শান্তি সমাবেশ করতে দেখা গেছে।
সকালে ঢাকার মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, গাবতলী, যাত্রাবাড়ি, মিরপুর সহ বিভিন্ন এলাকায় অবরোধ বিরোধী মিছিল করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এছাড়া সাভারের আমিনবাজার, হেমায়েতপুর এবং নারায়ণগঞ্জেও ছোট ছোট মিছিল করেছে সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা।







