উত্তমকুমারের নায়িকাদের মধ্যে অপর্ণা সেন বিশেষ একজন। উত্তম – অপর্ণা জুটি হয়ে অভিনয় করেছেন ‘অপরিচিত’, ‘কলঙ্কিত নায়ক’, ‘এখানে পিঞ্জর’, ‘জয়জয়ন্তী’, ‘মেমসাহেব’, ‘কায়াহীনের কাহিনী’, ‘রাতের রজনীগন্ধা’, ‘সোনার খাঁচা’, ‘আলোর ঠিকানা’, ‘ যদুবংশ’, ‘কাজল লতা’, ‘নিধিরাম সর্দার’ ছবিতে।
এসব ছবির মধ্যে ‘এখানে পিঞ্জর, ‘অপরিচিত’,’সোনার খাঁচা’ আর মেমসাহেব ছবিতে উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনয় করে খুবই প্রশংসিত হয়েছেন অপর্ণা। ‘অপরিচিত’-তে দস্তয়েভস্কির ‘রোগোসিন’- এর আদলে রঞ্জনের ভূমিকায় অভিনয় করেন উত্তম। সঙ্গে ছিলেন অপর্ণা।
ওই ছবির একটা দৃশ্যে আঙ্গুলে চাবির রিং ঘোরানোর কথা ছিল উত্তমকুমারের। একটা কথা শুনে চাবির রিংটা থেমে যাবে। এই থেমে যাওয়ার দৃশ্যটা অনবদ্য।
‘রাতের রজনীগন্ধা’-য় উত্তমকুমার অভিনয় করেন ‘রোমান হলিডে’ ছবির নায়ক
গ্রেগোরি পেকের চরিত্রে। উত্তম কিন্তু ছবিতে ওই বিদেশি নায়কের অনুকরণে অভিনয় করেননি। তিনি তাঁর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছিলেন। বিদেশি ছবির ভালো টাচগুলো নিজের মতো করে নিতেন।
উত্তমকুমারের অভিনয় প্রসঙ্গে এ সব কথা অপর্ণা সেনের। তাঁর মতে, উত্তমকুমারের সেরা অভিনয় ‘যদুবংশ’। তবে, শ্রেষ্ঠ ছবি ‘সপ্তপদী’। উত্তমকুমারকে কেমন দেখেছিলেন অপর্ণা?
‘মানুষ হিসেবে ছিলেন খুবই হাসিখুশি বন্ধুবৎসল। স্নেহশীল। দরদী। কোন বিপদে পড়লে ওঁর উপস্থিতি আমাদের সবাইকে নিশ্চিত করে তুলত। একবার দমদম এয়ারপোর্টে আমার গাড়ি আসেনি উনি আর বেনুদি (সুপ্রিয়া) ছিলেন। ওঁরা আমাকে বাড়িতে নামিয়ে তবে ফিরলেন।
কাজের সময় উত্তমকুমার ছিলেন পুরোপুরি সিরিয়াস। স্টুডিওর সেটে পৌছেই অভিনয়ের যথার্থ পরিবেশ গড়ে তুলতেন। কোন একটা ছবিতে দুজনে কাজ করছি একসঙ্গে। শট নেওয়ার আগে দেখি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে উনি একাই বার বার সংলাপ বলে যাচ্ছেন।
কিশোরী বয়সের কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি এতবার ডায়লগ পড়ছেন কেন?”
বললেন, “মাঝে মাঝে আমার একটু কথা আটকে যায়। সংলাপটা আয়ত্তে না রাখলে তাড়াতাড়িতে সেই স্টামারিংটা এসে যাবে।”
আমি তো মহানায়কের সরল স্বীকারোক্তি শুনে অবাক। উত্তমকুমারের জড়তা? ওঁর কত ছবি তো দেখেছি। কিন্তু ধরতে পারিনি তো। ওঁর কথা সেদিন আমার মনে খুব দাগ কেটেছিল।
ভাবা যায় ছোট এক অভিনেত্রীর কাছে এমন জনপ্রিয় নায়ক তাঁর দুর্বলতার কথা স্বীকার করতে পারেন!
উত্তমকুমারের সিনসিয়ারিটি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। কী একাগ্রতা আর নিষ্ঠা নিয়েই না উনি ধীরে ধীরে সমস্ত জড়তা কাটিয়ে উঠে পৌঁছে গেছেন জনপ্রিয়তার উচ্চশিখরে।
বাংলা ছবির একমাত্র রোমান্টিক নায়ক
উত্তমকুমার। ওঁর আগে কেউ ছিলেন না। পরেও নেই। ওঁর অভাবটা আরও বেশি করে বুঝতে পেরেছি নিজে পরিচালক হয়ে। নতুন ছবির কাস্টিং করতে বসলেই মনে হয়, ওই অসাধারণ প্রতিভাবান অভিনেতা আজ আর আমাদের মধ্যে নেই।
প্রথম যেদিন বাংলা ছবিতে কাজ করতে এলাম, সেদিন ‘উত্তমকুমার’ নামটার প্রতি আমার কোনো মোহ ছিল না।
আসলে বাণিজ্যিক ছবির তিনি অপরিহার্য ষ্টার হলেও, যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারিনি তাঁর। অথচ এখন ওঁর অভাবটা বুঝতে পারি প্রতিনিয়ত।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: আশীষতরু মুখোপাধ্যায়







