সঙ্গীত জগতের একজন কালজয়ী গীতিকার ও সুরকার হচ্ছেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার।
সঙ্গীত জগতের অন্দরে কান পাতলে শোনা যায় অন্য গীতিকারদের সঙ্গে সমস্যা না থাকলেও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের সম্পর্ক মোটেও মধুর ছিল না। আর সুযোগটা নিতেন নচিকেতা। তিনি দু’জনকেই এক সময়ে ডাকতেন। বলে দিতেন, যে ভাল লিখবে তাঁরটাই নেবেন। প্রতিযোগিতা শুরু হত গৌরী-পুলকের। এই লড়াই থেকে সোনার ফসলই পেতেন সুরকার নচিকেতা ঘোষ।
পাবনার গোপালনগর গ্রামে জন্ম গৌরীপ্রসন্নের। ১৯২৫ বাবা প্রেসিডেন্সি কলেজের খ্যাতনামা অধ্যাপক উদ্ভিদবিদ গিরিজাপ্রসন্ন মজুমদার। তাঁর সহপাঠীদের তালিকায় ছিলেন সি ভি রমন, ডক্টর রাধাকৃষ্ণন।পড়াশোনায় যতেষ্ট মেধাবী গৌরীপ্রসন্ন দুটো কলম আর কিছু খুচরো পয়সা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। টাকা না থাকলে হেঁটেই চলে যেতেন গন্তব্যে। হাজরা থেকে গড়িয়া হাঁটা ছিল ওঁর রোজকার ব্যাপার।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সবে শুরু হয়েছে। আকাশবাণীর অবসরপ্রাপ্ত অধিকর্তা শ্রীতরফদার তাঁর রেকর্ড প্লেয়ারে শোনাচ্ছিলেন ৭ মার্চের মুজিবরের বক্তৃতা। শুনতে শুনতে সিগারেটের প্যাকেটের সাদা কাগজে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার লিখে ফেললেন ‘শোনো, একটি মুজিবরের থেকে/ লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি/ আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি।’ সুর করলেন অংশুমান, গাইলেনও তিনি। গানটা ইংরেজিতে অনুবাদও হয়, ‘আ মিলিয়ন মুজিবর সিঙ্গিং’। ১৯৭১-এ মুজিবনগরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রী পরিষদের শপথ অনুষ্ঠানে বাজানো হয় সেই গান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭২-এর ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন গৌরীপ্রসন্ন। বাংলাদেশ রেডিয়োর জন্য লিখেছিলেন ‘মাগো ভাবনা কেন/ আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে’। হেমন্তের কণ্ঠে বিপ্লব এনেছিল সে গান।
অভিমান করে গৌরীপ্রসন্ন একবার বলেছেন কবিতায় সুর দিলেই গান হয় না। গানের ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা। তা না হলে রবীন্দ্রনাথ কবিতা ছাড়াও অত গান লিখতেন না। তিনি যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তা একটি গানের বইয়ের জন্য।
ক্যানসার ধরা পড়ার পরে শরীর ভাঙতে থাকে তাঁর। হাসপাতালে শুয়ে লিখেছিলেন শেষ গান, ‘এবার তাহলে আমি যাই, সুখে থাক ভালো থাক, মন থেকে এই চাই।’ ২০ অগস্ট, মাত্র ৬২ বছর বয়সে চলে গেলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ,বড় তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল বাংলা গানের স্বর্ণালী এক অধ্যায়।
সংগৃহীত।







