তাঁর বহুমুখী প্রতিভার কথা যদি বাদও রাখা হয়,তবুও বাংলা সাহিত্যের বিদগ্ধ মহল স্বীকার করেন ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাস রচনার জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক, তিনি মীর মশাররফ হোসেন৷
বঙ্কিমযুগেও তিনি অন্যতম প্রধান গদ্যলেখক, উনিশ শতকের বাঙালি সাহিত্যিকদের অন্যতম পথিকৃৎ,তাঁর লেখনী সাহিত্য রসে সমৃদ্ধ৷ মীর মশাররফ হোসেন বহুমুখী প্রতিভা ও লেখনীর মাধ্যমে বঙ্গ সংস্কৃতির আধুনিক সাহিত্য ধারার সূচনা করতে পেরেছিলেন।বাংলা সাহিত্যের মূল স্রোতের ইতিহাসে তাঁর স্থান অনেকটা উচ্চস্থানে৷ তাঁর রচিত ‘বিষাদ সিন্ধু’ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গদ্যের বিকাশপর্বেই প্রবলভাবেই আলোচিত।কারবালার করুণ ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে তাঁর রচিত উপন্যাস ‘বিষাদ সিন্ধু’ বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। অন্য গ্রন্থ অথবা তাঁর বহুমুখী প্রতিভার কথা যদি বাদ রাখা হয়,তবুও বাংলা সাহিত্যের বিদগ্ধ মহল স্বীকার করেন ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাস রচনার জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক,তিনি মীর মশাররফ হোসেন৷
বঙ্গ সমাজে তিনি প্রবাদপ্রতিম ও জনপ্রিয় লেখক। অথচ যে কালে এই খ্যাতি অর্জন করছেন,সেই সময় তাঁর জন্য খুব অনুকুল ছিল,এমন কথা হলফ করে বলা যায় না৷বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ প্রকাশিত হওয়ার চার বছর পর তিনিও লিখে ফেলেছিলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস “রত্নবতী'(১৮৬৯)৷ মুসলিম কবি সাহিত্যিকদের তালিকায় যেমন তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়,তেমন একথা বললে সত্যের অপলাপ হয় না, তিনি অন্যতম বাঙালি মনীষা যিনি বাঙালিদের মধ্যে অন্যতম আধুনিক সাহিত্য রচনার সূচনা করেছিলেন,পাশাপাশি তিনি বাংলা সাহিত্যের তিনি একজন শ্রেষ্ঠ লেখক৷’বিষাদ সিন্ধু’ অথবা ‘জমিদার দর্পণের’ স্রষ্টা মীর মশাররফ হোসেন উনিশ শতকের এক গুরুত্বপূর্ণ লেখক।’
গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকের’ সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার এবং ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় ছিলেন মীর মশাররফের অনুপ্রেরণার দুই মানুষ৷’আজিজন নেহার’ পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ায় পরে বাঙালি সমাজে, বিশেষ করে বাঙালি মুসলিম সমাজে বেশ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল,এই তথ্য জানা যায় তাঁর অপ্রকাশিত আত্মজীবনীতে,সেখানেই তিনি বলেছেন,মাতামহীর স্বর্গারোহণের পর ১২৮১ সালের ১লা বৈশাখ ‘আজিজন নেহার’ নামে বাঙ্গলা মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করিলাম। মুসলমান সমাজে এই বাঙ্গালা পত্রিকা বঙ্গদেশে প্রথম প্রকাশিত হইল। বাঙ্গালী মুসলমান সমাজ জানিত না বুঝিত না যে সংবাদপত্র কি?
প্রথম খন্ড প্রকাশ হইলে মহা আন্দোলন উপস্থিত হইল। ঘরের পয়সা খরচ করিয়া পরের ঘরে এরূপ খবরের কাগজ পাঠাইলে লাভ কি? সকল কথাই কি সত্য লিখা হয়? এত খবর পায় কোথা? যাহা হউক যিনি যাহা বলিতে লাগিলেন কান পাতিয়া শুনিতে লাগিলাম। মনকে দৃঢ় করিলাম। বিচলিত হইব না। যাহা সংকল্প তাহাই স্থির।
কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিক’এবং ও কবি ঈশ্বরগুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় লেখা থেকেই তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের হাতেখড়ি৷দুটো পত্রিকায় লিখেছেন৷ বাউল গান লিখে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ‘ফিকিরচাঁদ ফকিরের’ বাউল দলের সদস্য হয়েছেন৷ ‘মশা বাউল’ ভণিতায় বাউল গান রচনা করেছেন৷ কাঙাল হরিনাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আত্মরিক৷ ১৮৯০ সালে কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া থেকে ‘হিতকরী’ নামে একখানি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন মীর মশাররফ হোসেন৷ পত্রিকাটির বেশ কিছু সংখ্যা টাঙ্গাইল থেকেও প্রকাশিত হয়৷সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান এবং বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় তথ্যকোষ অনুযায়ী আজকের বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া গ্রামের এক বিত্তশালী পরিবারে ১৮৪৭সালের ১৩নভেম্বর মীর মশাররফ হোসেন জন্মগ্রহন করেন৷ বাবা মীর মোয়াজ্জ্বেম হোসেন, মায়ের নাম দৌলতন্নেসা।
পূর্ব পুরুষ সৈয়দ সা’দুল্লাহ বাগদাদ থেকে প্রথমে দিল্লীতে এসে মোগল সেনা বাহিনীতে যোগ দেন৷ মীর মশাররফ হোসেনের শিক্ষার প্রথম পর্ব বাড়িতেই, গ্রামের জগমোহন নন্দীর পাঠশালায় অধ্যয়ন, কুমারখালী এম. এন. স্কুল, কুষ্টিয়া হাই স্কুল পদমদী স্কুলে পড়ার পরে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হলেন৷ কলকাতায় বাবার বন্ধু নাদির হোসেনের বাড়িতে থাকার সময় নাদির হোসেনের কন্যা লতিফন্নেসা সঙ্গে প্রণয়৷তাদের বিবাহ হওয়া যখন একপ্রকার সুনিশ্চিত তখন মীরের ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে গেল বেশ বড় মাপের বিপর্যয়৷ নাদির হোসেন ভদ্রলোক তাঁর প্রথম কন্যার পরিবর্তে দ্বিতীয় কন্যা আজিজন্নেসার সঙ্গে মীর মশাররফের বিবাহ দিলেন৷মীরের সাংসারিক জীবন মোটেও সুখকর হল না, বেশ কয়েক বছর পরে তিনি কুলসুম বিবিকে বিবাহ করেলেন৷ প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিবাদ দীর্ঘস্থায়ী হয়,বাধ্য হয়ে মীর মশাররফ টাঙ্গাইলে চলে এলেন কুলসুম বিবিকে নিয়ে৷হুগলি থেকে ১৮৭৪ সালে তাঁর সম্পাদনায় ‘আজিজন নেহার’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল৷ মীর মশাররফ সম্প্রদায় সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী উদার মানসিকতা ও খাঁটি বাঙালিয়ানার চেতনায় উদ্বুদ্ধ মানুষ অবশ্যই সমাজ সচেতন এক লেখক।
বাঙালি মুসলিম সমাজ যখন স্বদেশ, মাতৃভাষা ও জাতীয়তার টানাপোড়েনে আক্রান্ত,সেই পিছুটানের মানসিকতার বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহন করতে পিছিয়ে যান নি৷ স্বদেশ,স্বাধীনতার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উঠে এসেছে মশাররফের লেখনীতে,তাঁর ভাবনায়-চিন্তায়৷এসব বিষয় যদি না ভেবে থাকেন তবে সিরাজগঞ্জে সংঘটিত কৃষক-বিদ্রোহের সমর্থনে ‘জমিদার দর্পণ’ নাটক তিনি লিখতে পারতেন না৷বাংলা সাহিত্যে মশাররফের বিচরণ ছিল অবাধ৷উপন্যাস,নাটক,কবিতা,থেকে পত্রিকা সম্পাদনা সব কাজ করেছেন দক্ষতার সঙ্গে৷
তাঁর গদ্যরীতি ছিল বিশুদ্ধ বাংলা।তবে তিনি কবি খ্যাতি লাভ করতে পারেন নি।মাতৃভূমির বিষয়ে মীর মশাররফ কোনওদিন দ্বিচারিতাকে স্থান দেননি৷ ভাষার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন উদার ও বাস্তববাদী৷মুক্তবুদ্ধির চেতনা থেকে বিচ্যুত হননি। বাঙালির সামাজিক ঐক্য সব সম্প্রদায়ের মিলনের মধ্য দিয়েই রচিত হওয়া সম্ভব এবং জাতীয় উন্নতির কোনো বিকল্প এই মিলন-প্রয়াস ভিন্ন সফল হতে পারে না—মশাররফ এই চিন্তায় অবিচল ছিলেন আজীবন৷
বাঙালি জাতিসত্তার আলোকেই তাঁর আত্মপরিচয় দিতে চেয়েছেন৷ বাংলা ভাষা, সাহিত্য তাঁর লেখনীতে সমৃদ্ধ হয়েছে,তিনি বাঙালির গর্ব৷মহান এই বাঙালি মনীষা ১৯ডিসেম্বর ১৯১২সালে প্রয়াত হওয়ায় ক্ষতি যা হওয়ার সেটা হয়েছিল বাংলা ভাষা,সাহিত্য ও বাঙালি জাতির৷
তথ্যঋন-প্রথম আলো







