“বাইশ বছর আগের দিনগুলোতে, ছোট্ট মেজবাহ …আমার ম্যাকলি কালকিন। কিছু ভাবতে পারছি না। হোম এলোন ছবির ম্যাকলি কালকিন (কেভিন) বলে ডাকতাম ওকে। সমবয়সী হলেও মেজবাহকে ছোট্টই ভাবতাম। সেইসব সময়ে দেখা হলে গাল টিপে দিতাম। গত বছর চট্টগ্রাম শহরের চেরাগীর মোড়ে দেখা। সেই ম্যাকলি কালকিন।” তোকে নিয়ে ম্যাসাঞ্জারে এসব যখন তিন্নী বলছিল, তখন আমরা তোর অপেক্ষায়। একটু পর তুই আসবি কলকতা থেকে। নতুন একটি ঠিকানায় চলে যাওয়ার জন্য। যেই ঠিকানা আর পরিবর্তন হবে না। তিন্নী আমাকে বলছিল — “তুমি লেখালেখি করো না কেন। এক সময় এতো ভালো চিঠি লিখতে।” জানিস, গত নয় বছরে কাউকে কোনো চিঠি লিখিনি। হয়তো কখনও লিখা হতো না। কিন্তু তোর এখন নতুন একটা ঠিকানা হয়েছে। আবারও তিন্নীর পুরনো প্রসঙ্গ নিয়ে উসকানি। তাই তোকে লিখা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এসব চিঠি নিয়ে তো তুইসহ অন্যরা কম মজা করিসনি। তোর কথা উঠলেই অনিবার্যভাবে নাজিম হিকমতের জেলখানার চিঠি কবিতাটি চলে আসে। সে লিখেছে — “বিংশ শতাব্দীতে, মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর।” সে হয়তো ঠিকই বলেছে। কিন্তু জানিস, আমার যে এখন একেকটা দিন বড় হতে হতে এক বছরে ঠেকেছে।
কতো কথাই তো মনে পড়ছে। সেই যে একবার তুই, সাইফুদ্দীন, জাবেদ, আমিসহ আরও কয়েকজন গভীর রাতে উত্তর ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল রাতে একটু ডিনারের জন্য খাবার সংগ্রহ করা। আর সেটি পরিণত হলো একটা ভয়াবহ অ্যাডভেঞ্চারে। আর তা নিয়ে সবাই কতো রকমের মিথ তৈরি করলো। আর বছরের পর বছর সেই গল্পের কথা পুনরাবৃত্তি করে সবাই মিলে আমাদের ক্ষেপানোর কতো অপচেষ্টা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ইয়ারের শেষের দিকে আমাদের সেইসব জম্পেস আড্ডায় পান্নার ভাবাবেগের কথা কি তোর মনে আছে? সে চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পেতো কালবেলা উপন্যাসের যতোসব বিবরণ। জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি আর ডুয়ার্সের চা বাগান। অনিমেষের মতো পান্না তখন শ্রেণী শত্রু খতম করার জন্য উদগ্রীব। এগুলো নিয়ে তাকে ক্ষেপানোরও চেষ্টা। যদিওবা ক্ষেপানোর লক্ষবস্তু হিসেবে ধ্রুব’দার প্রধান টার্গেট ছিলাম আমি। আর তোরা সেখানে ফুয়েল দিতি। ২০০৭ সালের ২০ আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের পর জেলখানার চিঠি কবিতাটি তোর কল্যাণে আমাদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। জেলখানা থেকে হিকমত তার বউকে বলেছিল, “বধূ আমার, তুমি আমার কোমল প্রাণ মৌমাছি/চোখ তোমার মধুর চেয়েও মিষ্টি।” আর আমরা সেই প্রথম লাইনটি বিকৃত করে পরষ্পরকে বলতাম — বন্ধু আমার, তুমি আমার কোমল প্রাণ মৌমাছি। আচ্ছা, তুই নিশ্চয়ই তোর বউকে অবিকৃত কবিতাটিই বলেছিলি। কয়বার বলতে পেরেছিস রে? বিয়ের দেড় মাসের মধ্যেই তো তুই ভিন্ন ঠিকানায় চলে গেলি।
দোস্ত বিল্ডিং-এর তিনতলায় সাইফুদ্দীনের সঙ্গে তোর ঝগড়ার কথা কি মনে পড়ে। ধ্রুব’দার সাইকেল নিয়ে।
এই কয়মাস আগেই তো তুইসহ হাসনাত ভাই (যাকে আমরা কমান্ডার বলে ডাকতাম) আমার অফিসে এসেছিলি। আবার যথারীতি ফাজলামো, পরষ্পরকে ক্ষেপানোর চেষ্টা। যেন ফার্স্ট ইয়ারে ফিরে গিয়েছি।
২৪ সেপ্টেম্বর তোর সঙ্গে শেষবার শহীদ মিনারে দেখা করতে গিয়ে কতোদিন পর রিপার সঙ্গে সাক্ষাত। অনেকটা বাকরুদ্ধ সে। একবার দিনাজপুর আর নীলফামারী গিয়েছিলি তুই। ২০০৬-এর দিকে। আমাকে লোভাতুর করার জন্য মোবাইলে লিখেছিলি — রামসাগর ও কান্তাজীর মন্দির দেখেছি। এত সুন্দর রূপ! এই জীবনে আমার আর দেখার কিছু নেই। কারণ, পার্টির কাজ বাদ দিয়ে অন্য কিছু করার রিরুদ্ধে আমার যে বাড়াবাড়ি ছিল — সেখানে হিট করাই ছিল তোর উদ্দেশ্য। অথচ কতো আগেই আমার ওই জীবন থেকে যবনিকাপাত। আর তুই শেষদিন পর্যন্ত।
সেই ১৯৯৭-এর শেষের দিকে প্রবর্তক মোড়ে প্রথমবারের মতো তোর সঙ্গে দেখা। ছাত্র ফ্রন্টের কর্মসূচিতে যাওয়ার জন্য আমাদের জমায়েতের স্থান ছিল সেটি। তোর ফটাফট কথা দূর থেকে শুনছিলাম। তারপর কৌতুহল নিয়ে তোর কাছে যাওয়া। চশমা পরা একটা পিচ্ছি। আবার সিগ্রেটও খায়। যদিওবা বিশ্বিদ্যালয়ের ফার্স্ট ইয়ারের শেষের দিকে তোর নিকোটিনের ওপর থেকে কেন জানি সব আগ্রহ শেষ। আর আমরা কোনো এক কবির উদ্ধৃতি দিয়ে বলতাম — ভাত খাই তো নিকোটিনের জন্যই।
মেজবাহ, জাবেদ, পান্না, প্রবীর, কলিন, হেলাল, সাইফুদ্দীন, রিপা আর তোদের সঙ্গে আমি — এই সার্কেলটা সংগঠনের ভিতর আর বাইরে অনেকর কাছে ঈর্ষার বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। আর ক্যাম্পাসে সময় পেলে তিন্নী তো আসবেই। কাঞ্চনদা, ধ্রুবদা, লিপিদি, দীপাদি, প্রণবদা এরা আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র হওয়ার পরও কেন জানি আমাদের সার্কেলের সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে আমাদের জুনিয়র ব্যাচগুলোর মধ্যে কিশোর মামুন, মিজান, সাজু, সবুজ, প্রবালসহ আরও অনেকেই আমাদের আশপাশে ঘুরঘুর করতো একটু আব্দার পুরণ আর ভালোবাসার জন্য।
হেলালের সেই আজাদ টাইটেলের সঙ্গে অবলীলায় আমরা যুক্ত করে দিয়েছিলাম একা শব্দটি। তার নাম হয়ে গেলো একা আজাদ। কতো কথাই তো মনে পড়েছে।
আবার হয়তো কোনো উপলক্ষ সামনে রেখে আমরা এক হবো। যেভাবে দুই/তিন বছর পরপর আমরা হই। দোস্ত বিল্ডিং, চেরাগীর পাহাড়, শিল্পকলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঝুপড়ি, কল্পনায় ডুয়ার্সের চা বাগান, রামসাগর বা কক্সবাজার সব কিছুরই হয়তো প্রাণচাঞ্চল্য থাকবে। আর এসবের মধ্যে তুই থাকবি না, এর কোনো মানে হয়? তুই তো অবশ্যই থাকবি। কারণ, বিপ্লব আর বিপ্লবীদের তো মৃত্যু হয় না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকরা যদিওবা একটু একা হয়ে যাবে। এটা কি তুই বুঝিস মেজবাহ?
পুনশ্চ: অনেক কিছুর জবাব তো জীবনে পাইনি। এই চিঠির জবাব না পেলেও কিছু মনে করবো না রে। ভালো থাকিস অহর্নিশ







