‘চাঁন মুখে মধুর হাসি/দেবাইল্যা বানাইল রে মোরে সাম্পানের মাঝি’। গ্রামোফোন রেকর্ডে মোহাম্মদ নাসিরের গাওয়া এই গানটি প্রায় ৮০ বছর ধরে চট্টগ্রামের মানুষের কাছে তুমুল জনপ্রিয় একটি গান। বছর বিশেক আগেও গানটি মোহাম্মদ নাসিরের কণ্ঠে বেতারে শুনেছি অসংখ্যবার। সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশকে এই গানটি আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী শেফালী ঘোষ, কক্সবাজার অঞ্চলের জনপ্রিয় শিল্পী বুলবুল আকতার ও লোকশিল্পী সেলিম নিজামীর কণ্ঠেও দারুণ জনপ্রিয় হয়। বছর পাঁচেক আগে গানটি নতুন সংগীতায়োজনে গেয়েছেন এ প্রজন্মের জনপ্রিয় ও গুণী শিল্পী সন্দীপন।
খুবেই ইতিবাচক ঘটনা, সাম্প্রতিক সময়ে টেলিভিশনে জাতীয় পর্যায়ের জনপ্রিয় দুজন শিল্পীর কণ্ঠেও (সন্দীপন ছাড়া) এই গানটি শুনলাম। সর্বশেষ আজ সকালে একটি চ্যানেলে শুনলাম শিল্পী সেলিম চৌধুরীর কণ্ঠে। এর আগে অর্নবের কণ্ঠে। সেলিম চৌধুরী হাছন রাজার গানের কাণ্ডারী। তাঁর কণ্ঠে এই গানটি বেশ লেগেছে।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার আইকনিক এই গানটির সঠিক পাঠ ও সুর সঠিকভাবে না জানায় গাইবার সময় গানটির বিকৃতি হচ্ছে, সেটা পীড়াদায়ক। সুর নিয়ে শিল্পীরা কিছুটা নিরীক্ষা করছেন, সেটা দোষণীয় নয়, কিন্তু গানের বাণী বিকৃত করে গাওয়া হচ্ছে। কল্যাণী ঘোষ সম্পাদিত বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান’ গ্রন্থটিতেও গানটির বাণী নিয়ে গণ্ডোগোল আছে। যেমন ‘দেবাইল্যা’ (দেওয়ানা হয়ে যাওয়া) শব্দটিকে ‘দেওয়াইল্যা’ লেখা হয়েছে। ‘লাল বঅটা’ শব্দটাকে ‘বরটা’ লেখা হয়েছে। এবং বর্তমান শিল্পীরা কেউ সেটাকে ‘বরটা’ কেউ ‘পরদা’ গাইছেন, যেমনটি আজ সেলিম চৌধুরী গাইলেন ‘লাল পরদা’ কিছুদিন আগে অর্ণব গাইলেন ‘লাল বরটা’।
গানটির একটি অন্তরা হলো :
কুতুবদিয়ার দক্ষিণ ধারে সাম্পানওয়ালার ঘর
লাল বঅটা দিয়েরে তুলি সাম্পানের উপর।
এখানে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘লাল বঅটা ‘ শব্দটার প্রচলিত অর্থ হলো ‘পতাকা’। সাম্পান-জাহাজে যে পতাকা থাকে তাকে চট্টগ্রামের মানুষ তাদের ভাষায় ‘বঅটা’ বলে। বঅটা হলো শৌর্যবীর্যের প্রতীক। যেমন আমরা কারও শৌর্য প্রকাশ করতে গিয়ে বলে ফেলি, ‘অমুক মিয়া বঅটা উড়াইয়ে…।’ এখন এই ‘বঅটা’ শব্দটাকে ‘বরটা’ বা ‘পরদা’ গাওয়ার কারণ বুঝতে পারছি না।
আসলে মোহাম্মদ নাসির হলেন সেই শিল্পী যার কণ্ঠে চাটগাঁইয়া গান (আঞ্চলিক ও মাইজভাণ্ডারী) বিশ্বপরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩২ সালে এইচএমভি থেকে কিংবদন্তী শিল্পী জগন্ময় মিত্রের তত্ত্বাবধানে নাসিরের প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড বের হয়, যেখানে ছিল দুটি মাইজভাণ্ডারী গান : ‘রসিক ভাণ্ডারী তোরে চিনব কেমনে ও বাঁশী বাজে হৃদমন্দিরে কে বাঁশি ফুঁকে’। এই রেকর্ড দিয়েই চট্টগ্রামের গান প্রথম দুই বাংলা ও বিশ্বসভায় ছড়িয়ে পড়ে। ওই বছরই ‘চাঁন মুখে মধুর হাসি’সহ দুটি আঞ্চলিক গান নিয়ে এইচএমভি থেকেই নাসিরের দ্বিতীয় রেকর্ড বের হয়।
২০০৯ সালের এপ্রিলে মোহাম্মদ নাসিরের মৃত্যুবার্ষিকীতে দৈনিক প্রথম আলোর আনন্দ তে একটি লেখায় আমি এসব অজানা তথ্য প্রকাশ করেছিলাম। এখন দেখি টিভিসহ নানান মাধ্যমে অনেকে এসব তথ্য বেশ গর্বের সাথে প্রচার করেন, কিন্তু তারা রেফারেন্স বলেন না।
ধন্যবাদ সবাইকে। জানা ও জানানোর জন্য এই লেখা, কাউকে দুঃখ নেওয়ার জন্য নয়। আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি তাই।







