ট্রফিকান্ডে বিতর্কিত বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মেহরুবা ইসলামকে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে একই পোস্টে ন্যস্ত করা হয়েছে। এ বদলীকে স্বাভাবিক বদলী বলছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
পাশাপাশি স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতারা এবং সচেতন মহল মনে করছেন ইউএনও’র সততা, কর্মদক্ষতা ও নিষ্ঠা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলছেন না। তিনি পাবলিক প্লেসের একটি পরীক্ষায় সাময়িক হেরে গেছেন মাত্র। তাই জনমতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকার তাকে বদলীর আদেশ দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে ইউএনও মেহরুবা ইসলাম বলেন, সীমান্ত চোরাচালান বন্ধে বিভিন্ন সময় ট্রাস্কফোর্স করে অভিযান পরিচালনা করায় একটি মহল তার উপর ক্ষিপ্ত ছিলো। তারা ট্রফিকান্ডের ঘটনাকে পুঁজি হিসেবে নিয়ে আন্দোলন করেছেন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি সমর রঞ্জন বড়ুয়া বলেন, ‘আলীকদম-মিয়ানমার সীমান্তে চোরাই পথে সরকারকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে পশু এবং মাদক প্রবেশের বিরুদ্ধে টাস্কফোর্স অভিযানে নেতৃত্ব দেন ইউএনও মেহরুবা ইসলাম।
হুন্ডির মাধ্যমে দেশের টাকা পাচার হচ্ছিল। এসব রাষ্ট্রবিরোধী অভিযানে তার উপস্থিতি এবং চোরাচালান বিরোধী অনড় সিদ্ধান্ত এই মহলটি অনেক দিন ধরেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তারই একটি বহিঃপ্রকাশ কথিত আন্দোলন-সংগ্রাম।’
মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানকালে আলীকদম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জিয়াউদ্দিন জুয়েল জানান, ইউএনও মেহরুবা ইসলাম আলীকদমে যোগদানের পর থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, যানজট নিরসন, তৃণমূলে সরকারি পরিসেবা বৃদ্ধি, পরিবেশ-প্রতিবেশ উন্নয়নের ডাক গিয়ে ‘অগ্রযাত্রায় আলীকদম’ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করেছেন। বিশেষ করে সীমান্ত চোরাচালান বন্ধে রাত-দিন অভিযান করেছেন। এতে গরু-ব্যবসায়ীদের রোষানলে পড়েন তিনি। সর্বশেষ ট্রফিকান্ডের ঘটনায় তার সব ভালো অর্জনগুলোকে নস্যাৎ করতে গরু ব্যবসায়ীরা আন্দোলন করেছেন।
স্থানীয় সাংবাদিক ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘জনগণের দাবীকে মূল্য দিয়ে আলীকদমের ইউএনওকে ঢাকা বিভাগে একই পোস্টে বদলী করা হয়েছে।’
স্থানীয় শিক্ষক এ এইচ বাপ্পী চৌধুরী বলেন, ‘তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর আলীকদমের পরিবেশ, বাজার ব্যবস্থা, গরুর হাট সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি করেছেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মাদক ও গরু চোরাকারবারীদের কঠোর হস্তে দমন করেন। কিন্তু যিনি সরকার ও জনগণের উপকার করেছেন তার বিরুদ্ধে কাহিনী তৈরী করা হলো।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে আলীকদম চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের মাংতাই হেডম্যান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে আবাসিক যুব স্বাধীন সমাজের উদ্যোগে ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। খেলা শেষে খেলোয়াড়দের দুইপক্ষের ঝগড়াকে শান্ত করতে ও বুঝাতে উদাহরণ দেখাতে খেলোয়াড়দের সম্মতিতে ট্রফি টেবিলে ছুড়ে মারেন ইউএনও। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের ভিডিও-কে কাটপিস করে পুরো ঘটনার আংশিক ভিডিও প্রকাশ করা হয়। যাতে একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে ইউএনও’র ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কাটপিসের ভিডিওকে পুঁজি করে আলীকদম এর একটি মহল ইউএনও’র বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়।
ফুটবল টুর্নামেন্ট পরিচালনা কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, ফুটবল খেলায় আবাসিক একাদশ ও রেপারপাড়া একাদশ দুই টিমই দুই গোলে ড্র করে। পরে খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। এতে আবাসিক দলকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তারা আরও বলেন, মঞ্চে অন্যান্য অতিথিরা বক্তব্য দেওয়ার পরে প্রধান অতিথির বক্তব্য শুরুর আগে হট্টগোল বাধে দুই টিমের মধ্যে। এতে খেলোয়াড়রা ইউএনওকে ট্রফি কাউকে না দিয়ে ভেঙে ফেলার আহবান জানায়। পরে ট্রফি ছুড়ে ফেলেন ইউএনও। এ ঘটনায় আমাদের কোনো অভিযোগ ছিল না। চৈক্ষ্যং ইউনিয়ন এলাকায়ও সমস্যা হচ্ছে না। যা হচ্ছে তা আলীকদম সদরকেন্দ্রিক। এতে নিশ্চয়ই কোনও রহস্য আছে।
চৈক্ষ্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন বলেন, পুরো ঘটনায় আমি উপস্থিত ছিলাম। খেলোয়াড়রা ট্রফি নিতে চাচ্ছেনা। তখন ইউএনও ট্রফি তার কাছে আমানত হিসেবে রাখার ঘোষণা দিয়ে নতুন করে খেলা আয়োজনের ঘোষণা দেন। পরে ইউএনও কর্তৃক ট্রপি ছুঁড়ে ফেলার পরও কোন সমস্যা হয়নি। প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন অন্যরা। এতে ইউএনও’র সব ভালো অর্জনগুলোকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দুংড়িমং মার্মা বলেন, চোরাচালান বন্ধে এবং তামাক চাষ নিরূৎসাহিত করতে ইউএনও মেহরুবা ইসলাম যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। উপজেলা পরিষদ এলাকায় তিনি ‘বঙ্গবন্ধু চত্বর’ করে মুক্তিযোদ্ধের অগ্রনায়কের নামকে সমুন্বত করেছেন। তৃণমূলে সরকারি পরিসেবার সুষম বন্টন এবং শিক্ষা-চিকিৎসা, গরু চোরাচালান বন্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখায় ক্ষুব্ধ ছিলেন সংশ্লিষ্টরা। তারা ট্রফিকান্ডকে হাতিয়ার হিসেবে নিয়ে আন্দোলন করেছেন। তবে সরকার জনমতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ইউএনও’র বদলীর আদেশ দেন।







