দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দ পেয়ে ইতোমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় বেশ জোরেশোরে প্রচার প্রচারণা শুরু করেছেন কক্সবাজার ১ (চকরিয়া পেকুয়া) আসনের সাতজন প্রার্থী।
তবে প্রার্থীদের মধ্যে মাঠে দেখা যাচ্ছে স্বতন্ত্র প্রার্থী বর্তমান এমপি আলহাজ্ব জাফর আলম (ট্রাক গাড়ি) এবং বাংলাদেশ কল্যাণ পাটির প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক এর (হাতঘড়ি মার্কা) প্রচারণা।
পাশাপাশি এলাকায় শোভা পাচ্ছে এই দুইজনের নির্বাচনী পোস্টার। একইসঙ্গে দুই প্রার্থী ইতোমধ্যে দুই উপজেলায় নির্বাচনী অফিস উদ্বোধন, জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে গ্যারন্টার হওয়ার কারণে ঋণখেলাপী সংক্রান্ত অভিযোগের মামলায় উচ্চ আদালতে আইনী জটিলতায় আটকে প্রার্থীতা ফিরে পাওনা নিয়ে অনিশ্চতার দোলাচালে রয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ সিআইপি। এ অবস্থার কারণে নৌকা নিয়ে নির্বাচনী এলাকায় কোনধরনের প্রচার প্রচারনা নেই। এতে অনেকটা হতাশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, জনসাধারণ ও দলীয় সমর্থকরা।
অতীতের ইতিহাস অনুযায়ী কক্সবাজার ১ (চকরিয়া পেকুয়া) আসনটিতে বিএনপির একটি শক্তিশালী ভোট ব্যাংক রয়েছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার কল্যাণে চকরিয়া ও পেকুয়ার জনপদ বিএনপির জন্য উর্বর ভূমি হিসেবে পরিচিত। তবে এবারের নির্বাচনে বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে অংশ না নেয়ায় এই আসনেও তাদের কোন প্রার্থী নেই।
এই প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিতব্য দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হবার পর স্বতন্ত্র এমপি প্রার্থী হয়েছেন এই আসনে নৌকার টিকেটে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী বর্তমান এমপি আলহাজ্ব জাফর আলম। তিনি ইতোমধ্যে ট্রাক গাড়ি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে প্রচার প্রচারণা শুরু করেছেন। তাঁর পাশাপাশি নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন বাংলাদেশ কল্যাণ পাটির প্রার্থী ও দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক।
দেখার বিষয় হচ্ছে, কক্সবাজার ১ আসনে নির্বাচনী মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থী বর্তমান এমপি জাফর আলম ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ সিআইপিকে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার সর্বস্থরের জনসাধারণ ও সাধারণ ভোটাররা আগে থেকে চিনলেও এই আসনের নতুন মুখ চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার বাসিন্দা বাংলাদেশ কল্যাণ পাটির প্রার্থী সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম এখানে একেবারেই অপরিচিত।
গত দুইদিন এই আসনের নির্বাচনী এলাকা চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরজমিনে গিয়ে স্থানীয় জনসাধারণ ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এইধরণের অভিমত পাওয়া গেছে।
বেশিরভাগ ভোটার ও উৎসুক জনগণের অভিমত, চকরিয়া পেকুয়া আসনে আমরা ঘরের ছেলে জাফর আলম নতুবা সালাহউদ্দিন সিআইপিকে এমপি পদে দেখতে চাই। বহিরাগত কোন প্রার্থীকে আমরা এখানে এমপি হিসেবে চাইনা। ভোটাররা যুক্তি তুলে ধরে বলেন, জাফর আলমের বাড়ি চকরিয়া পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পালাকাটা এলাকায়। অপরদিকে সালাহউদ্দিন আহমদ সিআইপির বাড়ি চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে।
ভোটাররা মনে করেন, আমরা চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার বাসিন্দা, ভোটারও এই জনপদের। তাই আমাদের ভোটের একমাত্র দাবিদার ঘরের ছেলে হিসেবে পরিচিত জাফর আলম বা সালাহউদ্দিন সিআইপি’র।
আমরা অতীতের মতো সুখ দুঃখে তাদেরকে কাছে পাবো। এলাকার দুর্যোগ দুর্দিন, সমস্যা সমাধানে তাৎক্ষণিক তাদের সহযোগিতা পাবো। এক্ষেত্রে বাইরের কেউ এমপি হলে এখানকার এলাকায় কতটুকু উন্নয়ন অগ্রগতি সাধিত হবে। স্থানীয় জনগণ কতটুকু সুযোগ সুবিধা পাবে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্নসাপেক্ষ।
চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা মুদির দোকানী মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, আমরা আগে ভোট দিয়েছি নৌকা অথবা ধানের শীষ প্রতীক।
এতদিন এলাকার ছেলে হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদ সিআইপিকে চিনি এবং জানি। কিন্তু এবারের নতুন প্রার্থী কল্যাণ পার্টির সৈয়দ ইবরাহিম নামে কাউকে আমরা চিনি না। আমরা যাদের নাম জানি, যাদের চিনি, তাদেরই ভোট দেব।
সুরাজপুর মানিকপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা নতুন ভোটার আবুল হাসনাত বলেন, চকরিয়া পেকুয়ায় রাজনীতি অঙ্গনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন কমবেশি সবাইকে চিনি। এলাকার মানুষ এমপি প্রার্থী হিসেবে জাফর ও সালাহউদ্দিন সিআইপিকে জানেন।
কিন্তু এমপি পদপ্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম নামে কাউকে আমি বা এলাকার লোকজন আদৌ চিনিনা। এমনকি তাঁর বাড়ি কোথায় সেটিও আমরা জানিনা।
চকরিয়া কোনাখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের এলাকায় এমপি পদপ্রার্থী হিসেবে সালাহউদ্দিন সিআইপিকে নারীপুরুষ সবাই চিনে।
পুর্ববড় ভেওলা ইউনিয়নের সিকদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা কৃষক আবদুল জব্বার বলেন, আমরা আগে থেকে চিনি আমাদের এলাকার এমপি হিসেবে বিএনপির সালাহউদ্দিন, আওয়ামী লীগের সালাহউদ্দিন সিআইপিকে, বর্তমান এমপি জাফর ও প্রাক্তন এমপি সালাহউদ্দিন মাহমুদকে। নতুন কে এখানে এমপি প্রার্থী হয়েছে, তাকে কোনদিন দেখিনি।
পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা চায়ের দোকানী আবদুল হাকিম বলেন, নির্বাচন আসলে অনেকেই প্রার্থী হন, কিন্তু তাদেরকে গ্রামের মানুষ ঠিকমতো চিনে না। সংসদ নির্বাচনে মানুষ ভোট দেন নৌকা বা ধানের শীষ মার্কা দেখে।
পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা লবণ ব্যবসায়ী ফজলুল কাদের বলেন, চকরিয়া পেকুয়া আসনের এমপি প্রার্থী সৈয়দ ইবরাহিম সাহেব এর নাম আমি কোনোদিন শুনিনি।
চকরিয়া লক্ষ্যারচর ইউনিয়নের ভোটার এক স্কুল শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার স্বর্তে বলেন, আমাদের এলাকার সন্তান সিআইপি সালাউদ্দিন। ঋণখেলাপির কারণে তিনি ভোটে দাঁড়াতে না পারলে প্রয়োজনে এলাকার অপর সন্তানদের কাউকে ভোট দেব। কিন্তু অপরিচিত কাউকে ভোট দেব না।
চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের লালব্রীজ এলাকার বাসিন্দা শওকত ওসমান বলেন, চকরিয়া পেকুয়া আসনে এমপি পদপ্রার্থী হিসেবে সৈয়দ ইবরাহিম নামে কাউকে আমরা চিনি না। তাঁর বাড়ি কোথায় তাও জানি না। আমরা ভোট দেব আমাদের এলাকার প্রার্থীকে। বাইরে থেকে এখানে এসে কেউ ভোট করলে তাকে ভোট দেব না।
কক্সবাজার-১ (চকরিয়া পেকুয়া) আসনে জাফর আলম (ট্রাক), সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম (হাতঘড়ি) ছাড়াও আরও পাঁচজন প্রার্থী হিসেবে আছেন।
তাদের মধ্যে জাতীয় পাটির (এরশাদ) হোসনে আরা আরজু (লাঙ্গল), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির হাজি আবু মোহাম্মদ বশিরুল আলম (হাতুড়ি), বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্টের মাওলানা বেলাল উদ্দিন (মোমবাতি), স্বতন্ত্র প্রার্থী তানভীর আহমেদ ছিদ্দিকী তুহিন (ঈগল) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী কমরউদ্দিন আরমান (খেলারছড়ি)।
আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে উন্নয়নের প্রতীক নৌকা নিয়ে চকরিয়া পেকুয়ার মানুষের দরজায় ফিরবেন বলে আশাবাদী আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সালাউদ্দিন আহমদ সিআইপি। তিনি বলেন, আমি ঋণখেলাপী নই। চক্রান্ত করে আমার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। ইনশাআল্লাহ আইনি লড়াইয়ে আমি সম্মান ফিরে পাবো।
তিনি বলেন, চকরিয়া পেকুয়া উপজেলার শান্তিপ্রিয় জনসাধারণ জোরজুলুম, অত্যাচার নিপীড়ন থেকে নিস্তার পেতে চান। সেইজন্য জনগণ এবার নৌকা মার্কায় ভোট দিতে অধীর অপেক্ষায় আছেন।
এই আসনের বর্তমান এমপি ও দ্বাদশ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহাজ জাফর আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে নৌকা না দিলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোট করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। আমি আমার এলাকার মানুষের সেবা করতে চাই। ঘরের ছেলে হিসেবে আমি সবার কাছে ট্রাক মার্কায় ভোট চাই।
ভোটারদের ভাষ্য, এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জাফর আলম ট্রাক মার্কা নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী। কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম হাতঘড়ি প্রতীক নিয়ে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সালাহউদ্দিন সিআইপি রয়েছেন আদালতে।
সেক্ষেত্রে ভোটার সাধারণের প্রশ্ন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সালাহউদ্দিন সিআইপি কী নৌকা নিয়ে আদৌ মাঠে ফিরবেন, নাকি কল্যাণ পাটির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অব সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক এখানে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক নিয়ে এমপি নির্বাচিত হবেন।







