বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীল চিন্তা জগতে শিক্ষাবিদ শাওয়াল খান একজন পরিচিত ও জনপ্রিয় লেখক। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি। বিভিন্ন বিষয়ের উপর নানান মাধ্যমে লিখেছেন। বিশেষ করে শিক্ষা, শিক্ষার উপকরণ, সংস্কৃতি ও শিক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি একজন গবেষক, লেখক, সমাজকর্মী ও অনুবাদক। সমাজের নানান অসঙ্গতি নিয়ে ভাবনা জগতে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বরেণ্য লেখক শাওয়াল খান মহেশখালি উপজেলার সিপাহির পাড়া গ্রামে ১৯৬৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে শাওয়াল খানের পরিবার বেশ আলোচিত ও সমাদৃত। তাঁর পিতার নাম কলিম উল্লাহ খান ও মাতার নাম বেগম মুস্তাফা খান। শিক্ষাজীবনের শুরুতে ভর্তি হয়েছিলেন সিপাহির পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি এ বিদ্যালয় হতে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছিলেন। পরে মহেশখালি আর্দশ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এ প্রতিষ্ঠানে তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। চকরিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন নবম শ্রেণিতে। এ প্রতিষ্ঠান হতে তিনি মানবিক বিভাগ থেকে ১৯৮২ সালে এস এস সি, বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৮৪ সালে এইচ এস সি পাশ করেন। তাঁর অধীত কলেজ ছিল চকরিয়া কলেজ।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরে উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৮৮ সালে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। ক্যাম্পাসে ছিলেন সবার প্রিয় নেত্রী। তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন। এ রকম মেধাবী ও প্রগতিশীল চিন্তার মহিলা তখনকার সময়ে খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। মহেশখালির মতো একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে জন্ম গ্রহণ ও বেড়ে উঠা সত্ত্বেও তিনি তৎকালীন নগর কেন্দ্রিক সকল ব্যবস্থার সাথে নিজেকে একাত্ম করতে পেরেছিলেন। । তখনকার সময়ে মহেশখালিতে উন্নত মানের কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। তাছাড়া নারী শিক্ষার ব্যাপারে সমাজে নানান কূপমন্ডুকতাও ছিল প্রবল। শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। মহেশখালির মতো অঞ্চলকে জ্ঞানগর্বে আলোকিত করেছেন; শুধু তা নয় সমগ্র দেশের নারী সমাজকে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করেছেন এ মহান লেখক শাওয়াল খান। শিক্ষা ও সংস্কৃতির আলো এ দ্বীপে পড়েনি। বিশেষ করে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে সে সময় এই এলাকা ছিল পশ্চাৎপদ ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীনই তিনি সৃজনশীল লেখালেখির সাথে যুক্ত হন। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতা করেছেন ছাত্রজীবন থেকেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালে বহু কবি,সাহিত্যিক, প্রথিতযশা পণ্ডিত ও বরেণ্য লেখকদের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটেছে। মহাত্মা আহমদ ছফা, কবি মোহন রায়হান,অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ও বহুমাত্রিক চিন্তাবিদ অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের সাথে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনার সুযোগ হয়েছিলো তাঁর । তাঁদের সান্নিধ্যে থাকার ফলে নিজের মধ্যেই লেখক সত্ত্বা জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন। লেখালেখির অনুপ্রেরণা এ মহান লেখকদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন শিক্ষাবিদ শাওয়াল খান।
ফরাসি দার্শনিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক ইমানুয়েল টডের একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব রাজনীতিতে সাড়া জাগানো একটি বই। এটি হলো ‘After the Empire : The breakdown of the American order ‘. শাওয়াল খান এ বইটির বাংলা অনুবাদ করেন। শিরোনাম দেন “মার্কিন সাম্রাজ্য পতনের পরে”। এটি প্রকাশ করে রোদেলা প্রকাশনী।
ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে Cross Studies বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি পাঠ্যবই হল ‘The Scarlet threat : An Indian Women Speaks’. তিনি আলোচিত এ বইটি অনুবাদ করেন। রাঙাডোরা নামে এ বইটি প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমি থেকে। ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমি পরিচালিত তরুণ লেখক প্রকল্পের দ্বিতীয় ব্যাচে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি , অক্টোপাস ওই প্রশিক্ষণের অর্জন। এছাড়া উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরে,(এখন যা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো) তথ্য ও প্রকাশনা কর্মকর্তা /সহকারী পরিচালক হিসেবে একদশকের বেশি সময় কাজ করেছেন। সাক্ষরতা উপকরণ উন্নয়নের হাতেখড়ি ওখানেই। এ সময় লেখক ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের সাক্ষরতা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। শিক্ষা, সাক্ষরতা, অব্যাহত শিক্ষা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে গবেষণামূলক তাঁর একটি জনপ্রিয় বই হলো শিক্ষাজগৎ। এ বইটিও বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
শিক্ষাকোষ প্রণয়নের ভাবনা শুরু হয় ১৯৯০-এ তার বাস্তবায়ন হয় ২০০৩-এ। ছত্রিশ পৃষ্ঠার ভূমিকা বাদ দিলেও আকারের দিক থেকে এ কোষগ্রন্থ প্রায় হাজার পৃষ্ঠার। বলা হয়ে থাকে এতটা পরিধি নিয়ে এবং এই কলেবরে বাংলা ভাষায় রচিত শিক্ষাকোষ বোধহয় এটাই প্রথম। এই কোষগ্রন্থে শিক্ষাবিদ শাওয়াল খানের লেখা কয়েকটি ভুক্তি অন্তর্ভুক্ত হয়। যেমন – সবার জন্য শিক্ষা, সাক্ষরতার আবশ্যিক দক্ষতা, সার্বিক সাক্ষরতা আন্দোলন, সাক্ষরতা সাংবাদিক ফোরাম, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, সমন্বিত উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর, স্যাটেলাইট স্কুল, একজন অন্যজনে শেখানো, আদালত খান, সৈয়দ নওয়াব আলী চোধুরী, নবাব, সংযোগ সময়- বয়স্ক ও কিশোর কিশোরী শিক্ষা ইত্যাদি। উপরের বইগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক বই হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
শিক্ষাবিদ শাওয়াল খান শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার বিষয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা করে আসছেন। শিক্ষার নানান বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে লিখে যাচ্ছেন। আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে তাঁর বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ছড়া সাহিত্য ও কথাসাহিত্য রচনার পাশাপাশি শিশু শিক্ষা, শিশু শিক্ষার উপকরণের ব্যাপারেও কাজ করছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে,
শিক্ষাজগৎ (২০০৯, বাংলা একাডেমি), অক্টোপাস (১৯৯৬, বাংলা একাডেমি), প্রতিবন্ধীরাও আমাদের মতই মানুষ (উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর), এমব্রয়ডারী নিটিং (হালনাগাদ), দর্জিবিজ্ঞান (হালনাগাদ), মৌ- চাষ (হালনাগাদ), পুস্তক বাঁধাই,, পেপারব্যাগ ও এনভেলাপ তৈরি (হালনাগাদ), হাঁস মুরগি পালন (হালনাগাদ), দুগ্ধখামার স্থাপন (হালনাগাদ), পশুপালন (হালনাগাদ), বর্ণের ছড়া ও বর্ণ পরিচয় (মে ২০২২,আগামী প্রকাশনী), True Friends of Children : English Alphabetical Rhymes (May 2022, Agamee Prokashani) ।
অনুবাদ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে,
রাঙাডোরা (২০০২, বাংলা একাডেমি), মার্কিন সাম্রাজ্য পতনের পরে (২০০৯, রোদেলা), আফেন্দির বুলিগল্প ( ২০১৯, বাংলা একাডেমি)।
সম্পাদিত গ্রন্থ :
মাতৃবন্ধু এ এইচ এম নোমান(২০২২,প্রতিবুদ্ধিজীবী), মহেশখালি: উন্নয়ন, নীতি ও নিয়তি( যৌথভাবে, ২০১৯,প্রতিবুদ্ধিজীবী) ।
কারিগরি ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে তাঁর বেশকিছু অনেক বই রয়েছে। এ বইগুলো বাস্তব জীবনে পাঠকের অনেক উপকারে আসবে। ১৯৯৮ সাল হতে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে গবেষণামূলক জার্নাল প্রতিবুদ্ধিজীবী। প্রতিবুদ্ধিজীবী’র সম্পাদক ও প্রকাশক হলেন জনাব সাদাত উল্লাহ খান। আর সমাজবিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চা জগতে প্রতিবুদ্ধিজীবী একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। এই প্রতিবুদ্ধিজীবী’র নির্বাহী সম্পাদক হচ্ছেন শাওয়াল খান। তিনি দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ভিন্ন ভিন্ন ইস্যু নিয়ে বহুবছর ধরে লিখছেন। তিনি পড়তে ভালবাসেন ও লিখতে পছন্দ করেন। তিনি বইয়ের সাথে সুনিবিড় সম্পর্ক তৈরি করেছেন বহু বছর ধরে। কল্পনা ও চিন্তাজগতে তাঁর নিজস্ব ভাবনার দুয়ার উম্মুক্ত রেখেছেন। নিজেকে ব্যপৃত রেখেছেন সাহিত্যের অন্ধিসন্ধিতে।
লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।







