মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। মাঝে মাঝেই মিয়ানমার থেকে গুলি, মর্টারশেল ও বোমার খণ্ড বিশেষ এসে পড়ছে সীমান্তের এপারে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। মিয়ানমার ভূখণ্ড থেকে আসা একটি মর্টারশেলের গোলার আঘাতে দুইজন নিহত ও এক শিশু আহত হয়। নিহতরা হলেন, জলপাইতলি এলাকর মৃত বাদশাহ মিয়ার স্ত্রী হোসনে আরা বেগম (৫৫) ও বালুখালী ৮ নাম্বার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মৃত দলু মিয়ার ছেলের নবী হোসেন (৭৩)। তাদের একজন বাংলাদেশী নারী ও বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছেন বিজিবির রিজিওনাল কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোরশেদ আলম। সীমান্তের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত বিজিবি ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে ঘুমধুম সীমান্তের জলপাইতলি এলাকায় মর্টারশেলের গোলা এসে আঘাত করলে তারা ঘটনাস্থলে মারা যান। তাদের লাশ উদ্ধার করে পরিবারে কাছে হস্তান্তর করেছেন নাইক্ষ্যংছড়ি থানা পুলিশ।
সোমবার বিকাল তিনটার দিকে নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম সীমান্তের জলপাইতলি এলাকার মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টারশেল বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন র্যাব-১৫ সিনিয়র সহকারী পরিচালক আবু সালাম চৌধুরী। এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মিয়ানমারের চলমান সংঘাত ও সহিংসতার বিষয়ে র্যাব অবগত আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বিজিবির পাশাপাশি র্যাব কাজ করছে। সীমান্তের বসবাসরত বাসিন্দাদের সর্তক থাকার অনুরোধ করেন তিনি। যেন ঘটনাকে ব্যবহার করে অপরাধীরা বাংলাদেশে ডুকে না পড়ে।
সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচ টায় ঘুমধুম সীমান্তের জলপাইতলি মিয়ানমারের ছোড়া মর্টারশেলে নিহতদের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বিজিবির রিজিওনাল কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোরশেদ আলম। সীমান্ত পরিদর্শন শেষে মিয়ানমারের আরকান রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরকান আর্মি ও সেদেশের জান্তা বাহিনীর সাথে চলমান সংঘাতময় সীমান্তের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন।
এসময় তিনি মিয়ানমারের ছোড়া মর্টারশেলের আঘাতে দুইজন নিহতের ঘটনায় বিজিবির পক্ষ থেকে দু:খ প্রকাশ করেন, একই সাথে মিয়ানমারের এহেন কর্মকান্ডের জন্য প্রতিবাদ করেন। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে অতিরিক্ত বিজিবির সদস্য মোতায়েন করা হয় বলে জানান।
তিনি বলেন, সীমান্তে বসবাসরত স্থানীয় বাসিন্দাদের সর্তক থাকার জন্য অনুরোধ করেন। এপর্যন্ত ৯৫ জন মিয়ানমার বর্ডার গার্ড় পুলিশ (বিজিপি) সদস্য প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে।
তিনি বলেন, “বিজিবি তাদেরকে (বিজিপি সদস্যদের) নিরস্ত্রীকরণ করে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে। বিজিপির আহত সদস্যের চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। “তাদের নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। ৭ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাকিদের অস্ত্র ও সরঞ্জাম তুমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিজিবি হেফাজতে রাখা হয়েছে।
সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘর্ষের জেরে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) এর ১০৬ জন সদস্য অস্ত্রসহ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদেরকে নিরস্ত্রীকরণ করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়েছে।
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একে. এম জাহাঙ্গীর আজিজ জানান, সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার থেকে আসা মর্টার শেলের গোলার আঘাতে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের একজন স্থানীয় বাসিন্দা হোসনে আরা (৫৫)। আরেকজন রোহিঙ্গা নাগরিক নবী হোসেন। তিনি এখানে কাজ করতে এসেছিলেন।

এছাড়াও সীমান্ত জুড়ে গোলাগুলির শব্দ তো আছেই। সোমবার সারাদিন থেমে থেমে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তে গুলি, মর্টারশেল ও বোমার শব্দ ভেসে আসছে। সীমান্তের পাঁচ থেকে ছয়টি গ্রামের বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে।
এদিকে, রবিবার মধ্যরাতে নতুন করে শুরু হওয়া গোলাগুলি সোমবার সারাদিন চলে। দুপুরে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী সামরিক হেলিকপ্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরকান আর্মিকে লক্ষ্য করে থেমে থেকে মর্টারশেল ও বোমাবর্ষণ করেন।
একইদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়েনের ধামনখালী, রহমতের বিল ও আঞ্জুমান পাড়া সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারে হওয়া সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনার জেরে গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত সীমান্তের সংঘাতময় পরিস্থিতি চলমান রয়েছে। এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। আতঙ্কে ঘর ছাড়ছে সীমান্তের বাসিন্দারা।
সীমান্তের সার্বিক পরিস্থিতি দেখতে উখিয়ার পালংখালী আঞ্জুমান পাড়া সীমান্ত পরিদর্শন করেছেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানভীর হোসেন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সালেহ আহমদ।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সকাল থেকে সীমান্তের কয়েকটি পয়েন্টে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। এলাকায় চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। যে মুহূর্তে অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয়রা সর্তক রয়েছে।
এদিকে, মিয়ানমারে সংঘাতের জেরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্ত এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সোমবার সকাল পর্যন্ত সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির ৯৫ জন সদস্য পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তবে এ রিপোর্ট লেখাকালিন সীমান্ত পেরিয়ে আরও ৮ জন বিজিপি সদস্য বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম সোমবার সকালে জানান, রোববার দিনভর বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) মধ্যে গোলাগুলি অব্যাহত ছিল। এতে সংঘর্ষের জেরে রবিবার সকাল থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত বিজিপির ৯৫ জন সদস্য অস্ত্রসহ তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তারা বিজিবির কাছে আশ্রয় চায়।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) মো. আশিকুর রহমান বলেন, রি লি থাইন (২২) ও জা নি মং (৩০) নামে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির দুই সদস্যকে রবিবার রাত ৮টার দিকে হাসপাতালে আনা হয়। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সোমবার সকালে আরও সাতজনকে হাসপাতালে আনা হয়েছে।
চকো/জে







