স্বাধীনতার পূর্বে প্রতিষ্ঠিত মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতাল কক্সবাজার জেলার অন্যতম হাসপাতাল। বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে কক্সবাজার জেলাধীন চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নে মালুমঘাট নামক স্থানে এটি প্রতিষ্ঠিত। অ্যামেরিকার খ্যাতিমান শৈল্য চিকিৎসক ডা. ভিগো বি অলসেন এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পর্যটন নগরী কক্সবাজার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতের জন্য বিখ্যাত হলেও কক্সবাজার জেলার চকরিয়ার মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতালের খ্যাতি কম ব্যাপক নয়।
চকরিয়ার ডুলাহাজারা ইউনিয়নে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাফারি পার্ক। এটি বাংলাদেশের প্রথম সাফারি পার্ক। ১৯৯৯ সালে এ পার্কটি ডুলাহাজারায় প্রতিষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলা শেষ হয়ে শুরুতেই কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলা। সমতলভূমি ও দীর্ঘ বনাঞ্চল পেরিয়ে সড়ক পথে যেতে হয় পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। অবশ্য লোহাগাড়ার চুনতি ইউনিয়ন থেকে বিশাল বনাঞ্চল শুরু।
বান্দরবান পার্বত্য জেলার সাথে সংযুক্ত থাকায় কক্সবাজার জেলার কয়েকটি উপজেলার অংশ পাহাড় ঘেরা সবুজের সমারোহে সজ্জিত। কক্সবাজার জেলার চকরিয়ার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মাতামুহুরী নদী পার হয়ে চকরিয়া উপজেলা শহর। এরপর আবার বনবাদাড় পেরিয়ে ডুলাহাজারা ইউনিয়ন। ঢাকা-চট্টগ্রাম থেকে চকরিয়া, ডুলাহাজারার মালুমঘাট, খুটাখালী, ঈদগাহ ও রামু উপজেলা পার হয়ে হিরাম কক্সের কক্সবাজারে যেতে হয়।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত পৃৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত। এ সমুদ্র সৈকতের দৈর্ঘ্য ১২০ কিঃমিঃ। ডুলাহাজারার দুর্গম পাহাড়ী এ এলাকায় তৎকালে হিংস্র পশু পাখির আনা-গোনা ছিল বেশি। লোকজনের ঘনবসতি ছিল কম। শিক্ষায় অনগ্রসর এ অঞ্চলের মানুষ খেত খামারে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ফসল ফলাতো, আর তা নিয়েই তাদের জীবন-জীবিকা। সুদূর অ্যামেরিকাবাসী মানবদরদী ডা. ভিগো বি অলসেনসহ একদল অ্যামেরিকান ১৯৬২ সালে ডুলাহাজারায় সফরে আসলে তাদের এক সফরসঙ্গী ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
মানবদরদী ডা. ভিগো বি অলসেন তখন মানব সেবার উদ্দেশ্যে চিকিৎসাসেবাকে প্রাধান্য দিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেন। ওই সময় তিনি লামা উপজেলায় ও বমুবিলছড়িতে জায়গা খুঁজতে থাকেন। উপযুক্ত জায়গা না পেয়ে ডুলাহাজারা ইউনিয়নের মালুমঘাট অঞ্চলকে হাসপাতাল তৈরির উত্তম স্থান হিসেবে নির্ধারণ করেন। আজকের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক তখন আরাকান সড়ক নামে পরিচিত ছিল। মহাসড়কটি ডুলাহাজারার মালুমঘাট অঞ্চলের বুক চিরে ধাবমান।
ডা. ভিগো বি অলসেন ডুলাহাজারার স্থানীয় জালাল সাহেবের মাধ্যমে বনবিভাগ থেকে ৪৮ একর জায়গা ২৫ বছরের জন্য লিজ নেয়। আরকান সড়কের পশ্চিম পাশে মালুমঘাট অঞ্চলে ১৯৬৪ সালে হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। সে সময় তিনি টিন সেড সেমিপাকা হাসপাতাল নির্মাণ করেন এবং ১৯৬৬ সালে হাসপাতালটি শুভ উদ্ভোধন করেন। যার নামকরণ করা হয় “মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিষ্টান হাসপাতাল”। এটি ডুলাহাজারার মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতাল নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।পরবর্তীতে পুনরায় এ জায়গাটি বনবিভাগ থেকে ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
আজ থেকে ৫৬ বছর পূর্বে এ হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ডা. ভিগো বি অলসেন নিজ হাতে চিকিৎসা করে হাজার হাজার অসুস্থ রোগীকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। সে সময় তাঁর সহযোগী ছিলেন, ডা. কেসাম, ডা. বিগো, ডা. স্পেস, ডা. বুলুক প্রমুখ খ্যাতিমানরা। এছাড়াও ওই সময় তাঁদের সাথে সেবিকা হিসেবে ছিলেন সিসটার বেকি দেবি, মেরিলো ব্রাউনেল, সিসটার জিনিউল। এরপর চন্দ্রঘোনা মেমোরিয়াল হাসপাতাল থেকে বাঙ্গালী নার্স দিয়েও রোগীর সেবা চালিয়েছিলেন। এছাড়াও ওনার সাথে স্থানীয় ডাক্তার শিশির ধর, ডা. সন্তোষ সহ আরো অনেকে ছিলেন।
মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিষ্টান হাসপাতালের জনক ডা. ভিগো বি অলসেন আমাদের মাঝে নেই। মহামানব শৈল্য চিকিৎসক ও লেখক ডাঃ ভিগো বি অলসেন ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারী ৯৫ বছর বয়সে অ্যামেরিকার একটি হোম কেয়ারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারে চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ডুলাহাজারা মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতালটি এখনও রয়ে গেছে। তবে এটি এখন আর আগের মতো টিনসেড ছাউনির সেমিপাকা ভবন নেই। ইতোমধ্যে এটি অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সমৃদ্ধ মডেল ভবন নিয়ে পরিপূর্ণ হাসপাতালের রূপ পরিগ্রহ করেছে। বর্তমানে এ বিশাল নতুন ভবনটি অ্যামেরিকার সংস্থা অইডঊ ও বিভিন্ন দেশের এসোসিয়েশন অফ বেপটিস এর অর্থায়নে তৈরি করা হয়েছে বলে মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। এ নতুন মডেল হাসপাতাল ভবনটি গত ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে উদ্ভোধন করা হয়। এ পর্যন্ত এ নতুন হাসপাতালে বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত মোট কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন ৪৩০ জন।
বর্তমানে এ হাসপাতালে অপারেশন বিভাগে রয়েছে সুদক্ষ এনেস্থেসিয়ান অধ্যাপক ডা. টিট ওয়েল, ডা. সিসটার ন্যান্সি, এনেস্থেসিয়ান সতীন্দ্র দে, নুর মোহাম্মদ, ডেলাগানা। ১৯৯৪ সালে ডা. ভিগো বি অলসেন অ্যামেরিকায় চলে যাওয়ার পর ১৯৯৬ সালে অ্যামেরিকার অন্যতম চৌকোস ডা. কেলি হাসপাতালটির পরিচালক ও প্রধান চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন। তিনি এখনও পর্যন্ত নিরলস পরিশ্রম করে এ হাসপাতালে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন এবং প্রতিষ্ঠানটি।পরিচালনা করে যাচ্ছেন।
আমি গত ২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাইক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হই। ডা. কেলি আমার বাম হাতের হাড়ের জয়েন্ট বিচ্যুতির অপারেশন সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন এবং ওনার সাথে সহযোগিতায় ছিলেন, সুদক্ষ এনেস্থেসিয়ালিস্ট সতীন্দ্র দে। পরবর্তী নির্ধারিত তারিখে আমি ওই হাসপাতালে ডা. কেলির কাছে পুনরায় চিকিৎসা নিতে গিয়েই জানতে পারি তিনি বাইক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। তখন আমি নিরাশ হয়ে বসার কিছুক্ষণ পর দেখলাম, ডা. কেলি ক্রাচে ভর দিয়ে এক পায়ে হেঁটে হেঁটে রোগীর সেবা দেওয়ার জন্য হাসপাতালে চলে আসলেন। তিনি পরম স্নেহে আমার চিকিৎসা করলেন। আমি হতবাক হলাম যে, তিনি আহত হয়েও দায়িত্বের প্রতি অবহেলা করেন নাই। রোগীর প্রতি ডা. কেলিরও ভালবাসার তুলনা হয় না। এ ছাড়াও তাঁর সাথে এ হাসপাতালে রয়েছেন, অ্যামেরিকান ডা. হেদার ফাউলার,ডা. সিসটার সুসান এইজ সহ স্থানীয় বেশ কয়েকজন চিকিৎসক চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত আছেন। নিখুঁত ভাবে রোগ সনাক্তের জন্য উন্নতমানের যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ পরীক্ষাগার রয়েছে এ হাসপাতালে। রয়েছে অনেক অভিজ্ঞ ল্যাব টেকনিশিয়ান।
ডুলাহাজারা মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা, বিশ্ববিখ্যাত শৈল্য চিকিৎসক ও লেখক ডা.ভিগো বি অলসেন স্বপ্নের দেশ আমেরিকা থেকে এসে এ দেশের কক্সবাজার জেলার ডুলাহাজারা এলাকায় হাসপাতালটি যখন স্থাপন করেন তখন ওই সময়ে ডুলাহাজারা ছিল গভীর বনাঞ্চল। তখন সেখানে বাঘ, ভাল্লুক, রামকুকুর, গোখরো সাপসহ হিংস্র প্রাণি বসবাস করতো। যোগাযোগ ব্যবস্থাও তেমন ভালো ছিলনা।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও শত বাঁধা বিপত্তি ছাড়াও নানান প্রতিকূল পরিবেশে ডা. ভিগো বি অলসেন কীভাবে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন, একমাত্র তিনিই জানেন। তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সময়টুকু এ হাসপাতালটিকে কেন্দ্র করেই কাটিয়েছেন। প্রত্যেক রোগীর প্রতি ছিলো তাঁর অমায়িক ও মার্জিত ব্যবহার।
রোগীরা ডা. ভিগো বি অলসেনকে দেবতার মতো শ্রদ্ধা করতো। তৎকালে বাংলাদেশের অধিবাসীরা ডা. ভিগো বি অলসেনের চিকিৎসা পাওয়াকে পরম সৌভাগ্য মনে করতো। হাসপাতালে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি তাঁর সৌহার্দপূর্ণ ব্যবহার, অকৃত্রিম ভালবাসা, বন্ধুসুলভ আচরণ ও মিষ্টভাষায় কথা বলায় তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের অভিভাবক। এলাকার মানুষের প্রতি ছিলো তাঁর গভীর ভালোবাসা। এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে তিনি সবসময় পাশে থেকেছেন। এলাকার বিভিন্নধর্মী মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে সহজে মিশে যেতে পারতেন তিনি। তাঁর এ গুণের জন্য সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ মুগ্ধ হতেন।
১৯৭০ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অনেক যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতার সাথে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ডুলাহাজারার স্থানীয় সংখ্যালঘুদের দিয়েছিল আশ্রয় ও খাদ্য সহায়তা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ডা. ভিগো বি অলসেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্য সহায়তা দেওয়ার অবদানের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে তাঁকে প্রথম বিদেশী নাগরিক হিসেবে প্রথম পাসপোর্ট (পাসপোর্ট নং ০০১) অনুমোদন ও প্রদান করেন। ডা. ভিগো বি অলসেন তাঁর বাস্তব জগতের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন একাধিক বই। তাঁর লেখা বইয়ের মধ্যে, “উধশঃধৎ উরঢ়ষড়সধঃ রহ ইধহমষধফবংয” বইটি খুবই উল্লেখযোগ্য।







