১৬৬১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একটি ভোর। গত কয়েকদিন ধরে দুর্গম অরণ্য, খাড়া ঝিরি ও খরস্রোতা খাল পাড়ি দিয়ে সেনাপতি ফতে খাঁর নেতৃত্বে সৈনিকরা যেন এক নতুন দিগন্তে উপনীত হলো। মাতামুহুরী নদীর এই সুরম্য তীরের সৌন্দর্য, প্রকৃতির ছায়াঘেরা পরিবেশ তাদের ক্লান্ত মনে এক অপ্রত্যাশিত আনন্দানুভূতি নিয়ে এল। চারিদিকের দৃশ্য ছিল সত্যিই মন মুগ্ধকর। ঘন সবুজাভ অরণ্য আর নীল আকাশের নিচে এক পাহাড় তখনও কুয়াশার আবছা বাষ্পীয় কণার আড়ালে ঢাকা। পশ্চিমে কুয়াশায় আবছা রূপালী রেখার মতো মাইলের পর মাইল চলে গেছে উত্তর-দক্ষিণমুখী এক দীর্ঘকায় পাহাড়ের সারি। তার দু’ধারে নিবিড় অরণ্যরেখা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। আর সুদূর পূর্ব দিকেও একই রকম উত্তর-দক্ষিণমুখী পাহাড়ের সারি যেন প্রকৃতির বিশালতা ঘোষণা করছিল।
এই নিবিড় ঘন বনরাজিকে আরও কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় তার রহস্যময়তা। নদীর তীরের সুবিশাল গর্জন গাছগুলি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, শীতের আদ্রতায় তাদের পত্র-পল্লব কিছুটা ম্রিয়মাণ হলেও, শাখাগুলি যেন নীল দিগন্তের দিকে উড়াল দিতে চাইছে। গাঢ় সবুজ থেকে ফিকে হওয়া পাতাগুলিতে কুয়াশার কণাগুলো সূর্যের আলোয় হীরার মতো জ্বলছিল, আগন্তুকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল অবিরত।
গাছের ডালে ডালে শালিক ও বুলবুলির ওড়াউড়ি এই ভয়ঙ্কর নীরবতার মাঝে যেন প্রকৃতির নিজস্ব সুর বাজাচ্ছিল। ঝিঁঝির ঝঙ্কার, পাখির কাকলি আর বন্য পশুর কোলাহল এই অরণ্যকে যেন জীবন্ত করে তুলেছিল।
এই অপার সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে, আগন্তুক দলের দলনেতা সেনাপতি ফতে খান ঘোষণা করলেন, “আমরা এই নদীর পাড়েই বসতি গড়ব!” তাঁর কথায় মোগল সৈন্যবাহিনী ও চাকমা নারী-পুরুষ একে অপরের দিকে তাকাল। তাদের চোখে ছিল বিস্ময়, ক্লান্তি এবং এক নতুন ভোরের স্বপ্ন, এক নতুন জীবনের অঙ্গীকার।
মোগল ইতিহাসের এই অংশটির সাথে মিল রেখে বলা যায় যে, মোগল যোদ্ধাদের দ্বারাই ‘আলীকদম’ নামকরণ হয়েছিল ১৬৬১ সালের মাঝামাঝি সময়ে।
কারণ, ১৬৬১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে আরাকান বাহিনীর অভিযানে শাহ সুজা সস্ত্রীক প্রাণ হারান। এরপরই মোগল যোদ্ধারা অরণ্য পাড়ি দিয়ে এই এলাকায় এসেছিলেন। ইতিহাস তাই বলে। মোগল যোদ্ধাদের আলীকদম আগমন, নির্গমন ও জুমিয়াদের নিয়ে পার্বত্য এই জনপদে জমিদারি প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত ইতিহসের পরবর্তী খণ্ডচিত্র আমরা ইতিহাস-ঐতিহ্য সুদূর অতীতের দিকে কল্পনার পর্বে বিধৃত করব। ‘আলীকদম’ নামকরণ প্রসঙ্গে উপর্যুক্ত মোগল ইতিহাসের পাঠ শেষে এবার আমরা অন্যান্য জনশ্রুতি নিয়ে আলোকপাত করতে পারি, যা এই স্থানের রহস্যকে আরও গভীর করে তুলবে।
ইতিহাসের ধূলিধূসর পথ বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা প্রায়শই এমন সব বাঁকে পৌঁছে যাই, যেখানে প্রকৃত তথ্য ও লোককথা মিলেমিশে এক অবিনশ্বর কাহিনির জন্ম দেয়।
এই লেখাটিও ঠিক তেমনই—এখানে ইতিহাসের খণ্ডচিত্র ও লোকজ বিশ্বাসের ফাঁকে ফাঁকে কল্পনার রঙে আঁকা হয়েছে একটি বিস্ময়কর যাত্রাপথ। এই কাহিনিতে ব্যবহৃত চরিত্র, স্থাননাম, ঘটনার বিন্যাস অনেকাংশেই ঐতিহাসিক সত্যের ছায়া বহন করলেও, এটি মূলত এক সাহিত্যিক পুনর্গঠন—যেখানে কবিতা, কল্পনা ও কালের প্রতিধ্বনি মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য ঐতিহাসিক কল্প-জগৎ। অনেকটা রাহুল সাংকৃত্যায়নের “ভোলগা থেকে গঙ্গা”-র মতো করে, এই লেখাও এক ধরনের কাল-অতিক্রমী অন্বেষণ। কিন্তু এটি কোনো নির্ভুল ইতিহাস নয়। বরং ইতিহাসের অতল গহ্বর থেকে তুলে আনা কিছু পারম্পরিক ইঙ্গিত ও সামান্য তথ্যের উপর ভর করে নির্মিত এক সাহিত্যিক সৃজন, যার উদ্দেশ্য সত্যের অনুসন্ধান নয়, বরং কল্পনার ভাষায় অতীতকে অনুভব করা।
সুতরাং, ইতিহাসের কঠোর পরিমাপকাঠি দিয়ে এই লেখার ধারাবাহিকতা যাচাই না করাই শ্রেয়। বরং পাঠক যেন এই কাহিনির অন্তর্লুকায়িত কাব্যিকতা, বর্ণনামূলক সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক সম্ভাবনার দিকে দৃষ্টি দেন—এটাই আমার প্রত্যাশা।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।







