সাগরে রাজত্ব বেড়েছে জলদস্যুদের। আত্মসমর্পণের পরও কমছে না জলদস্যুতা। সাগরে গেলেই জলদস্যুদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে জেলেরা। সম্প্রতি জলদস্যুতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে, উপকূলবর্তী জেলে সম্প্রদায় বিশেষ করে ট্রলার মালিক ও শ্রমজীবীরা প্রতিনিয়ত ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে জলদস্যুদের হাতে পড়ার ভয় এখন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
চলতি এপ্রিল মাসে ১০দিনের ব্যবধানে বঙ্গোপসাগরের সোনাদিয়া চ্যানেলের কাছাকাছির জলদস্যুদের কবলে পড়ছে প্রায় ৫০টির ও বেশি ট্রলার। জেলেদের মারধর, মাছ ও জাল লুট সহ ট্রলার ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে এতে জেলেদের ৩০কোটি টাকার অধিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সম্প্রতি সময়ে ৪জন জলদস্যু দেশীয় অস্ত্র ও তাজা গোলা সহ মহেশখালী থানা পুলিশের হাতে আটক হয়েছে, এর মধ্য রয়েছে হত্যা মামলার আসামিও। যারা স্থলে পুলিশের আটকের হাত থেকে বাচঁতে জলদস্যুতার জীবন বেঁচে নিয়েছে।
মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের খোন্দকারপাড়া এলাকার এরশাদুল্লাহ কোম্পানি বলেন,আমার ফিশিং ট্রলারটি সাগরে গিয়ে মাছ আহরণ করে আসার সময় জলদস্যুদের কবলে পড়ে। জলদস্যুরা মাঝিমাল্লাদের মারধর করে আহরণকৃত মাছ ও জাল নিয়ে নেয়। যাওয়ার সময় বলে যায় তাদের অনেক সদস্য পুলিশের হাতে আটক হয়েছে। তাদের জামিনে বের করতে অনেক টাকার প্রয়োজন। আমি সাগরে নিরাপত্তা চাই, যাতে জেলেরা কোনো বাঁধা ছাড়া মাছ ধরতে পারে।
মহেশখালী থানার ওসি কাইচার হামিদ বলেন,আমাদের কাছে গোপন সংবাদ আছে যে, বঙ্গোপসাগরের মহেশখালীর সোনাদিয়া চ্যানেলে ট্রলার ডাকাতি শেষে, ডাকাত দল অস্ত্র নিয়ে ডাকাতির উদেশ্য সাগরে দিকে যাচ্ছে। খবর পেয়ে মহেশখালী থানার টহল টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের ধাওয়া করে, ট্রলারটি গতিরোধ করা হয়। ট্রলারটি তল্লাশি করলে তাদের নিকট দেশীয় অস্ত্রসহ গোলা-বারুদ পাওয়া যায়। তাদের বিরোদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কুতুবজোম ইউনিয়নের জামায়াত নেতা আবুল হোসেন বলেন, ৭ এপ্রিল সোমরার রাত ৩টার দিকে স্থানীয় আলমগীরের মালিকানাধীন ফিশিং ট্রলার ৪৫অশ্ব শক্তির এফবি মায়ের দোয়া ডাকাতির শিকার হয়। ৩এপ্রিল সাবের আহমদের ৪৫ ও ৩৭ অশ্ব শক্তির ২টি ফিশিং ট্রলার এবং জিয়াউর রহমানের মালিকানাধীন ৪৫অশ্ব শক্তির ১টি ট্রলার ডাকাতি শিকার হয়। এসময় তাদের কাছ থেকে মাছ,জাল ও বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে যায়।এ তে তাদের ৪৫ লক্ষ টাকার মত ক্ষয়ক্ষতি হয়। বর্তমানে তাদের ট্রলার সাগরে পাঠানোর মত অর্থ নাই।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের মেম্বার রিমন বলেন, সোনাদিয়া চ্যানেলে প্রতিনিয়ত ট্রলার ডাকাতি হচ্ছে এমন অভিযোগ জেলেরা প্রায় করে, তাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই।
ডাকাতির শিকার হওয়া ট্রলার মালিকেরা বলেন,অনেক টাকা ধারকর্জ করে সাগরে ফিশিং করতে ট্রলার পাঠানো হয়। এর মধ্যে ট্রলার ডাকাতি হলে অনেক দেনা বেড়ে যায়। দেনা পরিশোধ করতে না পারলে মহাজনেরা আমাদের উপর অনেক প্রেশার দেয়। এতে ভিটে মাটির বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না।
স্থানীয় সচেতন মহল জানাচ্ছেন, সোনাদিয়ার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডাকাতির ঘটনা অহরহ ঘটে। সাধারণ জেলেদের উপর গুলিবর্ষণ করে মাছ, জাল ও ট্রলারের আসবাবপত্র নিয়ে যায় জলদুস্যুরা। এতে জেলেরা কোনো শব্দ করলে তাদের উপর চলে আসে না ফেরার দেশের ঠিকানা। কখনো জেলেদের কোলস্টোর রেখে ,গুলি করে অথবা রশি বেঁধে সাগরে ফেলে হত্যা করা হয়। জলসদস্যুদের হাতে এভাবে জীবনে গেছে অনেকে জেলেদের। সম্বল হারিয়েছে অনেক ট্রলার মালিক। এভাবে কেউ ছেলে হারিয়েছে, কেউ বাবা ও স্বামী হারিয়েছে। যারা স্বজন হারিয়েছে সেই পরিবার গুলোর রোজগার করার মত কেউ থাকে না। অকালে পড়ালেখা থেকে ঝরে পড়তে হয় তাদের ছেলে মেয়েদের।
মহেশখালী জোনের কোস্ট গার্ড কন্টিনজেন্ট কমান্ডারের নিকট জলদস্যুদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোস্ট গার্ডের টহল জোরদার ও নজরদারি রয়েছে সাগরে। নিরাপত্তার জন্য কোস্টগার্ডের পক্ষে থেকে সব ধরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিকে জেলেদের পক্ষ থেকে সাগরে নিরাপত্তার জন্য ৪টি দাবি পেশ করা হয়েছে। দাবীগুলো হচ্ছে,
১।নৌ-পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের টহল জোরদার করা।
২।উপকূলীয় এলাকাগুলোতে নজরদারি ক্যাম্প স্থাপন।
৩।জেলেদের জন্য ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও সুরক্ষা সিস্টেম চালু করা।
৪। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে জলদস্যু বিরোধী কমিটি গঠন।







