গল্পের নায়ক তখনও কিশোর। বয়স ১৫ কী ১৬। প্রাইমারির চৌকাঠও মাড়ায় নি। নায়িকাও তাই। মাত্র কৈশোরে পা। পড়ছে নিম্ন প্রাইমারীতে। ব্যবধানটা পারিবারে। ছেলেটি খুব একটা ধনী পরিবারের নয়। সাধারণ ঘরের একেবারে সাধারণ একটা ছেলে। বিপরীতে মেয়েটি পারিবারিকভাবে যথেষ্ঠ বিত্তশালী ও সম্ভ্রান্ত । এলাকার জমিদার তনয়া। এক স্নিগ্ধ বিকেলে দু’জনার দৃষ্টি বিনিময়। তারপর মন বিনিময়। পত্র বিনিময়। চুপি চুপি। আড়ালে-আবডালে। লোকচক্ষুর অন্তরালে চলতে থাকল হাসি বিনিময়, রাগ-ক্ষোভ-মান-অভিমান-ভাব বিনিময়। ধীরে ধীরে প্রেম জমে ক্ষীর। জমে উঠল কাহিনী। ধীরে ধীরে সেই কাহিনী ছড়াল লোকমুখে। যুগের নিয়মে ততদিনে মেয়েটির বিয়ে ঠিকঠাক। বাগদানও সম্পন্ন। পাত্র এলাকার জমিদার তনয়। কিন্তু তাতে কী? প্রেম চলছে প্রেমের নিয়মে-অবাধ, বেপরোয়া ভঙ্গি ও স্বকীয় মহিমায়। প্রেমপুরে যে জীবনপুরের নিয়ম অচল! তাতেই জন্ম নিল সিনেমা ! বাগদানের পরও মেয়েটি রোজ পত্র দিত। আর বার বার আকুতি জানাত, ‘একটা কিছু করেন, আপনি একটা কিছু করেন’। ছেলেটিকে বার বার পীড়াপীড়ি করত, ‘এই অশুভ বিবাহের পূর্বেই আমি যাতে আপনার হতে পারি, সেই ব্যবস্থা করেন। যা করার, দ্রুত করেন। না হয়, আপনি আমাকে হারাবেন। আমি বলে দিলাম কিন্তু।’ওই সময় মেয়েটি বিষপানে আত্মহত্যার হুমকি পর্যন্ত দিল। কিন্তু ছেলেটি নিরুপায়। সে জানে, প্রস্তাব দিলে সে প্রত্যাখ্যাত হবে। তাই চিঠির উত্তরে সান্ত্বনার বুলিই তাঁর একমাত্র আশ্রয়। আর উপায় খুঁজত থাকে, কাকে দিয়ে প্রস্তাব দিলে, অন্যের বাগদত্তা হওয়ার পরও মেয়ের পরিবার তাকে ‘না’ বলতে পারবে না। একসময় পেয়েও গেল তেমন একজন। কিন্তু ততক্ষণে পানি গড়িয়ে গেছে অনেক দূর। এক কান দু’কান করে, তাদের প্রেম কাহিনী পোঁছে গেছে বাগদত্তা জমিদার তনয় ও তাঁর পরিবারের কানে। সিনেমার চিরাচরিত নিয়মে, সাথে সাথে তারা আবির্ভূত হলেন ভিলেন হিসেবে। তারা কিশোর ছেলেটির উপর কেবল খড়গহস্তই হল না, তার জীবন দুর্বিষহ ও বিপদসংকুল করে তুলল। তার বিরুদ্ধে মামলা দিল। বহুরূপী বিভীষিকায় তার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলল। এমনকি তাকে হত্যার জন্য পেশাদার ঘাতক ভাড়া করল। ওই ঘাতক রাতের আঁধারে তাঁর ঘরে হাজির হল যমদূত রূপে। ওই রাতেই নিভে যেতে পারত ছেলেটির জীবন প্রদীপ। ওই দিনই অপমৃত্যু হতে পারত ছেলেটির সমস্ত সম্ভাবনা ও প্রতিভা। কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল ভিন্ন। নিতান্ত সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যায় ছেলেটি। পরদিনই গ্রাম ছাড়ে ছেলেটি।
প্রেমাকাঙ্খার চেয়ে তখন জীবন বড়। জীবন বাঁচাতে হাজির হয় চট্টগ্রাম শহরে। সেখানে এক গোপন আস্তানায় ঠাঁই নেয়। কিন্তু সেই স্বস্তিও বেশি দিন সইল না। ঘাতকরা দ্রুতই জেনে যায় সেই ঠিকানা। সেটা বুঝতেই এবার আর কোন ঝুঁকি নয়, সোজা জাহাজ করে একেবারে বার্মামুলুক (বর্তমান মায়ানমার)! জীবন বাঁচাতে সেখানে মংডু শহরের এক স্টীমার ঘাটে ঘাঁটি গাড়ে ছেলেটি। তারপর কিছুদিন স্টীমার কোম্পানীতে কেরাণীগিরি, কিছুদিন গৃহশিক্ষকতা, কিছুদিন অন্যকিছু। প্রেমের কারণে বিদেশ বিভুঁইয়ে এমন বিচিত্র, অদ্ভুৎ ও অনিশ্চিত জীবনই সঙ্গী হয়ে উঠে ছেলেটির। জীবনের নানা ঘাটে নোঙর করে, জীবনের বিচিত্র নদীতে সাঁতার কেটে, ঠেকে ঠেকে, ঠকে ঠকে কালের পরিক্রমায় সেই ছেলেটি হয়ে উঠল সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী। আর মেয়েটি ছিল তাঁর কাকারা গ্রামের বালিকা খাইরুন্নেসা।
সিদ্দিকীর ওই কৈশোর প্রেম তাঁকে এতটা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে, এর প্রভাব ছিল সারাজীবন ও সর্বগ্রাসী। সামাজিক অত্যাচার, অবিচার, মামলা, হামলা, ঘাতকের হানা খাইরুন্নেসাকে তাঁর কাছ থেকে শারীরিকভাবে সরিয়েছে বটে। কিন্তু ওই মুখ, ওই চোখ, ওই হাসি; সারাজীবন তাঁর চোখ থেকে সরাতে পারেনি এক দন্ড। এমনকি নিজের বিয়ের সময়ও তাঁর মনোজগতে ওই মুখ উদ্ধারহীনভাবে তাড়া করে ফেরে। সিদ্দিকীর জবানীতেÑ‘পিতা ও আত্মীয়স্বজন আমার বিবাহ প্রস্তাব লইয়া বড়ই উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িলেন। আমি স্থিরপ্রতিজ্ঞ ছিলাম যে, খাইরুন্নেসার ন্যায় সুন্দরী, শিক্ষিতা ও বড় ঘরের মেয়ে না হইলে বিবাহ করিব না। কিন্তু তখন আমাদের সাংসারিক যে অবস্থা দাঁড়াইছে, তাহাতে এমন কল্পনা আকাশ-কুসুম।’
কেবল বিয়ে নয়, সিদ্দিকীর সাহিত্যচর্চায় ওই প্রেমের প্রভাব ছিল অসামান্য। সিদ্দিকীর প্রথম উপন্যাস ছিল ‘নুরন্নেহার’। এই উপন্যাস আর কিছইু নয়, তাঁর সাথে খাইরুন্নেসার উত্তাল-পাতাল প্রেমের সরস বয়ান। খাইরুন্নেসার বিয়ের ২-৩ বছরের মাথায় উপন্যাসটির জন্ম। পরবর্তীতে তা কলকাতার মখদুমী লাইব্রেরী থেকে প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাস নিয়ে সিদ্দিকী আত্মজীবনীতে বলেনÑ‘কি ভাবিয়া আমি খাইরুন্নেসার সহিত আমার যে প্রেমাভিনয় ঘটিয়া গিয়াছে, তাহা নিয়া একখানা উপন্যাস লিখিয়া ফেলিলাম।….উপন্যাসখানা আমার মতনই হইল।’
‘নুরন্নেহার’ প্রসবের প্রায় ১ বছর পর একই বিষয়কে উপজীব্য করে লেখা ‘চিন্তা’ নামক একটি সংগীত পুস্তিকার জনক হন। এ বিষয়ে সিদ্দিকী লিখেনÑ ‘এই পুস্তকে খাইরুন্নেসাকে একটি কুসুম বলিয়া মনের আবেগ প্রকাশ করিয়াছি। তাহা অবসরে সহচররূপে প্রত্যহ পাঠ করিয়া কথঞ্চিৎ শান্তি উপভোগ করিতাম।’ কৈশোরের প্রেম বালিকাকে নিজের অন্তরে, আত্মায়, শয়নে-স্বপনে সিদ্দিকী কতটা ধারণ করতেন, প্রতিনিয়ত কতটা অনুভব করতেন; এই স্বগতোক্তি থেকে তা সুস্পষ্ঠ। এমনকি সিদ্দিকীর সামাজিক ও পারিবারিক উপন্যাস ‘জরিনা’কেও তাঁর কৈশোর প্রেমের প্রভাবপুষ্ট মনে করা হয়।
ছিদ্দিকী উচ্চ শিক্ষিত ছিলেন না। ছিলেন স্বশিক্ষিত। একই সঙ্গে মেধাবী। নিম্ন প্রাইমারী স্কুলে থাকতেই তাঁর সেই মেধার স্ফুরণ ঘটে। উচ্চ প্রাইমারীতে অংশ নিয়ে পান ছাত্রবৃত্তি । চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘হিতবাদী’পত্রিকায় তখন তাঁর নামও প্রকাশিত হয়। কিন্তু ওই কৈশোর প্রেমই তাঁকে ধীরে ধীরে স্কুল বিমুখ করে তোলে। ওই প্রেম-বালিকাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে তাঁর কাছে অর্থহীন করেন তোলে। বৃত্তি পেয়ে ইংরেজী শেখার জন্য গ্রাম ছেড়ে সিদ্দিকী ভর্তি হন কক্সবাজার শহরের মধ্য ইংরেজী বিদ্যালয়ে। কিন্তু খাইরুন্নেসার প্রেমে এতটাই অন্ধ ছিলেন, তার টানে শেষমেষ কিছু দিন পরই ‘ব্যাক টু প্যাভিলিয়নের’ মত ওই স্কুল ত্যাগ করে গ্রামে ফিরে এলেন। কক্সবাজারে স্কুলের বোর্ডিংয়ে থাকতেন তিনি।
ওই সময়ে পরিবার-পরিজনহীনভাবে দিনযাপনের মনোকষ্ট ও নিজের ঘর-কাতরতার বর্ণনা দিতে গিয়ে আত্মজীবনীর এক জায়গায় লেখেনÑ ‘সকলের চেয়ে অধিক যন্ত্রণাদায়ক হইয়াছিল সেই সরলা বালিকা খাইরুন্নেসার প্রাণখোলা ভালবাসা ও সেই অযাচিত আত্মদানের মধুর স্মৃতি। মন বড়ই বিচলিত হইল। কোথাও শান্তি পাইলাম না। শয়নে স্বপনে কেবলই সেই ছবিখানি মানস-পটে ভাসিতে লাগিল। অনেক চেষ্টা করিয়াও তাহার অনপনেয় মূর্তিখানি হৃদয়পট হইতে মুছিয়া ফেলিতে পারিলাম না। যতই তাহাকে ভুলিতে চেষ্টা করি, ততই যেন আরও মধুময়, আরও উদাস করা ছবিখানি আমাকে উজাড় করিবার মত করিয়া চাপিয়া ধরে। কক্সবাজার আমার চোখে ভীষণ নরকের ন্যায় অনুমিত হইল।’ এই উক্তি বিশ্লেষণ করলেই বুঝা যায়, কী তীক্ষ্ণ, তীব্র, প্রগাঢ় ও গোগ্রাসী ছিল সিদ্দিকীর সেই কৈশোর প্রেম।
মধ্য ইংরেজী বিদ্যালয়ের পর সিদ্দিকী নাম লেখালেন নিজ গ্রামে সদ্য প্রতিষ্ঠিত মধ্য বাংলা বিদ্যালয়ে। এখানেও সেই একই কাহিনী। খাইরুন্নেসার প্রেমের ভূতে মাত্র ৭ মাসে ছাত্রত্বের সমাপ্তি। তবে এই সমাপ্তিটা অন্যবারের মত সাময়িক ছিল না। এ ছিল সারা জীবনের তরে স্কুলজীবন ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি। এরপরে স্কুলের গন্ডিতে আর তাঁর পা পড়েনি। সেই স্মৃতি রোমন্থন ও বিশ্লেষণ করে সিদ্দিকী লিখেনÑ ‘নিয়মিত ৭ মাস মধ্যবাঙ্গালা অধ্যয়ন করিয়া বিদ্যাশিক্ষার প্রতি বিরাগভাজন হইলাম। নানা প্রকার উচ্ছৃঙ্খলতা আসিয়া আমার চিত্তকে ছিন্নভিন্ন করিয়া ফেলিল। খাইরুন্নেসার প্রণয়সুধা পান করা ব্যতীত আমার জীবনে আর কিছুতেই শান্তি হইবে না। এখন হইতেই সেই চেষ্টায় আত্মনিবেশ না করিলে ভবিষ্যতে সে আশা বাতাসে মিশিয়া যাইবে, এই আশংকায় বড় চিন্তিত হইয়া পড়িলাম। মনে করিলাম, প্রেয়সীর মুখ সন্দর্শন ভিন্ন যখন একদিনও থাকিতে পারিব না, তখন মধ্যবাঙ্গালা পাশ করিয়া আমি কি করিব? নানা চিন্তায় হৃদয় উদ্বেলিত হইয়া উঠিল। আমি স্বেচ্ছায় স্কুলের পড়া ছাড়িয়া দিলাম।’
অর্থ-বিত্ত, যশ-খ্যাতি, ক্ষমতা-নেতৃত্ব, জমিদারীÑএক জীবনে সিদ্দিকী অনেক কিছুই পেয়েছেন; অনেক কিছুই দেখেছেন। কিন্তু একটা অপ্রাপ্তি তাঁর সব প্রাপ্তিকে ম্লান করে দিয়েছে। একটা অতৃপ্তি বাকি সব তৃপ্তিকে তুচ্ছ, মূল্যহীন করে দিয়েছে। একটা মুখ দেখার ক্ষুধা, বাকি সব কিছুকে বৃথা করে দিয়েছে। সেটা হল ‘খাইরুন্নেসা’। তাইত জীবনের পড়ন্ত বেলায় আত্মজীবনীতে সিদ্দিকী লিখেছেন, ‘স্কুল ত্যাগ করিয়াছি, ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করিয়াছি, অবসর মোটেই নাই। তবু ঐ একদিনের জন্যও আমি খাইরুন্নেসার অপূর্ব প্রেম বিস্মৃত হইতে পারিলাম না।’ এই আক্ষেপ, এই হাহাকার, এই আকুতি তাঁকে কুরে কুরে খেয়েছে আমৃত্যু। প্রেমিক পুরুষ সিদ্দিকীর এমন জীবন ও জীবনবোধ যেন হেলাল হাফিজের কবিতার মতÑ ‘ভালোবাসা যাকে খায়, এইভাবে সবটুকু খায়’।
লেখক: আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব। কলামিস্ট ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট । ইমেইল: aftabragib2@gmail.com







