সম্পদ আলী একজন বড় মাপের ঠিকাদার। দীর্ঘদিন যাবত ঠিকাদারী ব্যবসায় জড়িত থাকার সুবাদে টাকা পয়সা ভালোই উপার্জন করেছেন। সম্পদ আলী যে দেশে বসবাস করেন সেদেশে গুণীজনের কদর নেই, কর্মস্থলে যোগ্য কর্মীর নিয়োগ নেই, দক্ষ কর্মকর্তার পদোন্নতি নেই। যোগ্য নেতার কদর নাই, অযোগ্যরা দল চালায়, তেলবাজরা নেতা চালায় অর্থাৎ সবক্ষেত্রে অযোগ্য, অদক্ষ, ঠকবাজ, প্রতারক, ও মতলববাজদের জয়জয়কার।
আমরা জানি মানুষ তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই এসব অনিয়ম, অনাচার দেখতে দেখতে সেদেশের মানুষের চিন্তাধারাও এমন হয়ে গিয়েছিল। সবার চিন্তা একটাই- কম পরিশ্রমে অথবা বিনা পরিশ্রমে বড়লোক হওয়া।
একদিন সম্পদ আলী তার প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন যাবত কর্মরত ম্যানেজারকে জরুরী ভিত্তিতে তলব করলেন। বললেন- তুমি দীর্ঘ ২০ বছর যাবত আমার প্রতিষ্ঠানে আছ, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর ঠিকাদারি ব্যবসা করবো না। একটা দুতলা বাড়ি নির্মাণের কাজ পেয়েছি, এটা আমার জীবনের শেষ কাজ। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমাকে আগামী এক বছর দেশের বাইরে থাকতে হবে। তাই আমার অবর্তমানে বাড়ি নির্মাণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তোমাকেই পালন করতে হবে। যেহেতু এটা আমার জীবনের শেষ কাজ তাই এখানে কোনো রকম হেরফের করা যাবে না, মালমশলা ঠিকভাবে দেবে, কোন কিছু যেন ঘাটতি না হয়। এই বলে তিনি একটা চেক বইয়ের সবগুলো চেকে স্বাক্ষর করে বইটি তার হাতে তুলে দিয়ে চলে গেলেন।
তার পরের ঘটনা আর বললাম না। বিড়ালকে মাছ পাহারা দিলে যা হয় আরকি! নিম্নমানের মালমশলা ব্যবহার করে ম্যানেজারের কপাল খুলে গেল। এক বছর পর ঠিকাদার দেশে ফিরে ম্যানেজারকে নিয়ে বাড়িটি দেখতে গেলেন। ঠিকাদার জিজ্ঞেস করলেন বাড়িটি ঠিকভাবে বানিয়েছো তো? জবাবে ম্যানেজার বললেন- এটা যেমন আপনার জীবনের শেষ কাজ, আমার জীবনেরও শেষ কাজ। আমিও আর চাকরি করব না, তাই সেভাবে কাজ করেছি (একটা বাড়ি নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ, আর চাকরি করার দরকার কী!) ঠিকাদার খুশি হয়ে বললেন- নাও আজ থেকে এই বাড়ী তোমার। তোমার জন্যই এই বাড়ি বানিয়েছি। মুনিবের এই উদারতা দেখে ম্যানেজার হতভম্ব।
আমার এক বড় ভাই যার সাথে আমার নিয়মিত পদচারণা, আড্ডা অনেক কিছু। তিনি সব সময় একটি কথা বলেন- আমরা কেউ সৎ নই। শুধু সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকি। সুযোগ পেলেই আমরা শুধু মুখে নয় হাতে পায়ে একসাথে খাই। আমি উনার সাথে একমত নই। আমি বলি- আপনিও একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান। আপনি যখন যে প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে করেছেন, আমি দেখেছি আপনার এই নিষ্ঠার কারণে প্রায় মৃত অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
এখন আপনি যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আছেন সেটা ছিল একসময় চকরিয়ার সবচেয়ে খারাপ রেজাল্ট করা প্রতিষ্ঠানের একটি। আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই মরা প্রতিষ্ঠানটি হলো পুরো কক্সবাজার জেলার কয়েকটি সেরা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি। এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে ও পালন করতে গিয়ে উনাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে, অদ্যবদি হচ্ছে।
বাংলাদেশে এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ হলো জনমিতিক লভ্যাংশ। কোন দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ ভাগ বা তার বেশি কর্মক্ষম হলে ঐ অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলে ধরে নেয়া হয়। এটা কোন জাতির জীবনে একবার আসে অথবা কয়েকশো বছরের মধ্যে একবার আসে ।
এই সময়টা আমাদের দেশে শুরু হয়েছে ২০০৭ সালে এবং থাকবে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত। এ সময়টুকু যথার্থ ব্যবহার করতে পারলে নিঃসন্দেহে আমরা ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবো। এক্ষেত্রে আমাদেরকে আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপে যেভাবে দৈত্যকে বোতল বন্দি করে রাখে একইভাবে আমাদের রাজনীতিবীদের দীর্ঘদিনের লালিত দূর্নীতিকেও বোতল বন্দি করতে হবে।
আমাদের হাতে এখন কাজ করার মত মানুষ বা জনশক্তি আছে। এখন সরকারের দায়িত্ব হলো এই শক্তিকে নিপুণভাবে কাজে লাগানো। মেধার ভিত্তিতে, যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদেরকে কাজে লাগানো। দলীয় বিবেচনায় ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ বন্ধ করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হোক প্রতি সেক্টরে। শিক্ষাঙ্গনের সুন্দর পরিবেশ চাই, সুস্থ ধারার ছাত্র রাজনীতি চাই।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ চাই, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য চাই। আমি পূর্বেই বলেছি আমরা আশেপাশের পরিবেশ দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত হই। গল্পে ঠিকাদার যেদেশে বসবাস করে সেদেশের সামাজিক অবস্থা ভালো হলে নিশ্চয়ই ম্যানেজারাও দূর্নীতি পরায়ন না হয়ে দায়িত্বশীল হতো এবং মুনিবের প্রতি বিশ্বস্ততার পরিচয় দিতো। দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ ভাগ যেহেতু যুবক তাই তাদেরকে ঘরে, বাইরে, কর্মস্থলে, রাজনীতিতে ভালোভাবে ব্যবহার করে এর সুফল ঘরে তুলতে হবে।
যদি এর ক্ষুদ্র অংশও পথভ্রষ্ট হয় অথবা খারাপ কাজে ব্যবহৃত হয় তাহলে তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পুরো যুবসমাজই বিপথগামী হবে নিঃসন্দেহে। যদি মেধাবীদের অবমূল্যায়ন করা হয় তাহলে তারা হতাশাগ্রস্থ হয়ে মাদকাসক্ত হয়ে যাবে। যদি তাদেরকে মেধা চর্চার সুযোগ দেয়া না হয় তাহলে সেই মেধা উন্নত দেশগুলোতে পাচার হয়ে যাবে।
বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছ ব্যবহার খুবই জরুরী। আবারো আমার সেই ভাইয়ের কথায় ফিরে যাচ্ছি- “আমরা কেউ সৎ নই, শুধু সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকি” এই কথায় আমি একদম বিশ্বাসী নয়। আমি মনে করি আমরা সবাই সৎ। শুধু পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা ভুল করে থাকি অর্থাৎ কোন পদে যেকোন কারণে ভুল মানুষকে নিয়োগ দিয়ে থাকি। সেটা রাজনৈতিক কারণে হতে পারে, নিয়োগ বাণিজ্যের কারণে হতে পারে, স্বজনপ্রীতির কারণে হতে পারে, হতে পারে আরো অনেক কারণে। এই ভুল মানুষের নিয়োগ আমরা দাপ্তরিক কাজে যেমন দেখি, রাজনীতির ক্ষেত্রেও দেখি। এই ভুল মানুষ বা অযোগ্য কর্মকর্তা বা নেতা নিয়োগের কারণে অনিয়ম হয়, কাজের পরিবেশ নষ্ট হয়, ভালো জুনিয়র উৎপাদনে বন্ধ্যাত্ব হয়ে আরো অনেক নিস্কর্মা কর্মী সৃষ্টি হয়।
এই অলস কর্মীরাই একদিন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা হয়, দলের প্রধান হয়। এটা শুধু আমার কথা নয় শেষ তিন দশকের চিত্রও তাই। এভাবে চলতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতে গিয়ে আমরা একটি পঙ্গু জাতিতে পরিণত হবো।
এজন্য নিয়োগ বা দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে যে অনিয়ম হচ্ছে দৈত্যের মত তাকে বোতল বন্দি করতে হবে। প্রতিটি সেক্টরে সঠিক মানুষ নিয়োগ দিতে পারলে থলের যে কালো বিড়ালকে আমাদের লিড়ারগন হন্য হয়ে খুঁজছেন তা আপনাআপনি ধরা দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।







