যানজটে কক্সবাজার শহরের জনজীবন নাকাল। শহরের সড়ক ও নালা মেরামতের কারনে কক্সবাজার শহরের বাসিন্দারা এবং এই শহরে বাইরে থেকে নানা কাজে আসা লোকেরা বছর-দেড়েক আগে শহরের একস্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে বেশ ভোগান্তি পোহায়েছিল ।
পৌরবাসীরা কষ্ঠ সহ্য করে অপেক্ষা করছিল নালা-ফুটপাত-সড়ক মেরামত ও সম্প্রসারণ হলে শহরবাসীরা অনায়াসে হাঁটাচলা ও গাড়ি নিয়ে চলাচল করতে পারবে এই আশায়।
প্রায় বছর খানেক হলো, প্রধান সড়কের সাথে যুক্ত নালাগুলো এবং আরো কিছু ছোট সড়কের নালা সংস্কার করে ফুটপাত নির্মিত হয়েছে। ফুটপাতের উপর টাইলস বসানো হয়েছে। সুদৃশ্য ফুটপাত দিয়ে হাঁটাচলা করতে কার না ভালো লাগে। কিন্তু শহরের ব্যস্ততম এলাকা বড়বাজার, বাজারঘাটা, পান বাজার রোড, হাসপাতাল রোড প্রভৃতি এলাকা যানজটে শহরবাসীর চলাচলে এখন প্রতিনিয়ত নাজুক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সড়ক সম্প্রসারণ ও ফুটপাত নির্মান হলেও ব্যস্ত শহরের কয়েকটি স্থানে সিএনজি স্টেশন বসানোর কারণে এবং ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় এখন কক্সবাজার শহরে চলাচলে পরিস্থতি চরম অবনতি হয়েছে। সরকার অনেকদিন পর কক্সবাজার শহরের উন্নয়নে সড়ক সম্প্রসারণ, নালা সংস্কার ও ফুটপাত নির্মান করলেও জনগণ তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে।
সম্প্রতি নতুন পৌর মেয়র অভিষিক্ত হয়েছেন এবং তিনি শহরের যানজট দূরীকরণে ও নালা-নর্দমা দখল উচ্ছেদের একটি এ্যাকশন প্লান ঘোষণা করেছেন। তাতে শহরবাসী আশান্বিতও হয়েছেন। নতুন পৌর মেয়রের এ্যাকশন প্লানকে সমর্থন দিয়ে শহরের জনজীবনের বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যানজটের প্রধান কয়েকটি কারন চিহ্নিত করা যেতে পারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কক্সবাজার শহরের হাসপাতাল সড়ক, পানবাজার রোড, বাজারঘাটা ও বড়বাজার প্রভৃতি এলাকায় যানজটের প্রধান কারন হিসেবে তিনটি স্থানে সিএনজি স্টেশন বসানোই প্রধানত দায়ী । দেখা যায়, শহরের ভোলাবাবুর পেট্রোল পাম্প এলাকায় সিএনজি স্টেশন বসানো হয়েছে। এই স্থানটি হলো শহরের অতি ব্যস্ততম একটি এলাকা। এ স্থানটি পানবাজার রোড ও হাসপাতাল সড়কের ক্রসিং স্থল হওয়ায় এবং ওষুধ কেনাকাটা ও বিভিন্ন প্যাথলজি ও জেলা হাসপাতালে এবং বিভিন্ন ডাক্তারের চেম্বারে যাতায়াতের জন্য রোগী ও রোগীর সঙ্গী-সাথীদের অনাগোনার প্রধান জায়গা।
ভোলাবাবুর পেট্রোল পাম্প এলাকায় সিএনজি স্টেশন বসানোর ফলে ওখান থেকে যাত্রী নিয়ে শতশত সিএনজি হাসাপাতাল সড়ক হয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে দিয়ে মরিচ্যা, উখিয়া প্রভৃতি দূরাঞ্চলে ছুটে যায়। এ ছাড়া সারাদিন-রাত শতশত সিএনজি একই পথ দিয়ে যাত্রী নমিয়ে দিয়ে আবার যাত্রী ভরতে ছুটে আসে।
এতে যানজটের ফলাফল হচ্ছে ভয়াবহ। শহরবাসীর কেউ বা রোগী বা রোগীর সাথী স্বাভাবিকভাবে হাসপাতাল রোড হয়ে হেঁটে বা রিক্সা নিয়ে হাসপাতালে বা স্টেডিয়ামের দিকে যাবার পরিস্থিতি আর থাকে না।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ওই পথ দিয়ে কোনো সিরিয়াস রোগী নিয়ে কোনো গাড়ি বা রিক্সা কম সময়ে জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সহজে ঢুকতে পারে না।
এছাড়াও হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেইট সংলগ্ন সড়কে সবসময় কিছু সিএনজি টেক্সি চলার ভান করে থেমে-থেমে যাত্রী খোজাখুঁজি করতে থাকে এবং জরুরি বিভাগের সামনের সড়কে যানজট সৃষ্টি করে। তাতে করে সড়কটিতে স্বাভাবিক হাটাচলা করা কিংবা রিক্সা নিয়ে যাতায়াত করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠে।
শহরের যানজটের দুই নম্বর পয়েন্টটি হলো: আই বি পি রোড সংলগ্ন বাজারঘাটায় সিএনজি টেক্সি স্টেশন স্থাপন।
ওখানে রামুগামী বাসের স্টেশন রয়েছে। ওটি বহুবছরের পুরোনো স্টেশন। তাছাড়া আইবিপি রোডে রয়েছে এই শহরের মালামাল উঠানামার প্রধান ট্রাক-স্টেশন। এই যায়গাটিতে সারাদিন বড় ট্রাক থেকে মালামাল নামিয়ে ঠেলাগাড়ি, ভ্যানগাড়ি ও লেবারদের আনাগোনায় মুখরিত স্থান।
সম্প্রতি ওখানে অর্থাৎ রামুগামী বাস-স্টেশনের পাশেই একটি সিএনজি স্টেশন বসানো হয়েছে। এই স্থান থেকে সারা দিনরাত শতশত সিএনজি রামুসহ প্রভৃতি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রী নিতে আসা-যাওয়া করতে থাকে।
এতে শহরের বাসিন্দারা হেঁটে বা রিক্সায় চড়ে বড় বাজারে কেনাকাটা করতে যেতে- আসতে হিমসিম খায়। সবচেয়ে বড় কথা, এই সিএনজিগুলো রাতদিন হাসপাতালের পেছনের রোডটিকে ব্যস্ত করে রাখে এবং বার্মিজ মার্কেট-বৌদ্ধমন্দির-গোলদিঘী এলাকা থেকে আসা গাড়িগুলো হাসপাতালের উত্তর-পূর্বকোণায় এস আর এগুতে পারে না।
এই সিএনজিগুলোই জেলা হাসপাতালের চারপাশে একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে চলে।
হাসপাতালের প্রধান গেইট সংলগ্ন উত্তর পাশের রাস্তার উভয় পাশে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে অবৈধভাবে দুই সারি দোকান বসিয়েছে। হাসপাতালের প্রধান গেইটের পূর্ব পাশের রাস্তার অনেকাংশ দখল করে নিয়েছে ওষুধ কোম্পানীর বাজারকর্মীদের মোটর সাইকেল। হাসপাতালের রোগী, এলাকার পথচারী প্রভৃতি নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ সকলে রাস্তার মাঝখান দিয়ে পথ হাতড়িয়ে মরিয়া হয়ে চলাচল করে।
এ এক অবাক কান্ড! মনে হবে হাসপাতালের উত্তর পাশের সড়কটি ছোটছোট দোকানী ও ওষুধ কোম্পানীর লোকদের নিকট ইজারা দিয়েছে কেউ! ওষুধ কোম্পানীর লোকেরা কেন পথচারীর হাঁটাচলার জায়গা দখল করে নিয়ে তাদের নিজেদের মোটর সাইকেল রাখবে?
তাদের কোম্পানী হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করে চলেছে। তাদের কর্মীদের গাড়ি রাখার জন্য তারা অবশ্যই একটি নির্ধারিত নিরাপদ জায়গা ভাড়া করতে পারে। কিন্তু তা না করে জন ও যান চলাচলের রাস্তা দখল করে রাস্তাকে মোটর বাইক রাখার অঘোষিত পার্ক বানিয়ে ফেলেছে। কেন তারা ফুটপাত দখল করে জনউৎপাত সৃষ্টি করবে আর প্রশাসন তা চোখ বুজে মেনে নেবে?
শহরের যানজটের তিন নম্বর পয়েন্টটি হলো: কক্সবাজার শহরের বড়বাজারের হার্ডাওয়ার মার্কেটের সরু রাস্তায় খুরুশকুলগামী সিএনজি স্টেশন। শহরের সকল মানুষকে পায়ে হেঁটে বা রিক্সায় চড়ে এই বড় বাজারে যেতে হয়। কিন্তু হাঁটাচলার এখানকার রাস্তাটি খুরুশকুলগামী সিএনজি টেক্সিগুলো দখল করে নিয়েছে। উক্ত সিএনজিগুলো সারা দিনরাত লোক হাঁটাচলার স্থানে অবস্থান করে, ঘোরাফেরা করে যাত্রী তোলার জন্য।
এই টেক্সিগুলোর উৎপাতে কেনাকাটা করতে যাওয়া লোকজনকে কোনো দোকানে ঢুকে যেতে হয় কিংবা কারো বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় অথবা টেক্সিগুলোর ধাক্কা মারার ভয়ে রাস্তা ছেড়ে পালাতে হয়।
বড় বাজারের মাছের ও সবজি বাজারে যেতে হলে লুঙ্গি অর্ধেক উপরে তুলে যেতে হয় নতুবা হাফ পেন্ট পড়ে যাওয়াটাই উত্তম। ফুল-পেন্ট পড়ে বড়বাজারের মাছের আর সবজিবাজারে গেলে পেন্টে কাদা লেগে যাবেই। আর বাসায় এসে এই কাদা ধুতে হয়। কারণ রাস্তার কিছু অংশ দোকানীরা তাদের দোকানের মালামাল রেখে দখল করে নিয়েছে, জন চলাচলের হাঁটা চলার কোনো জায়গা অবিশষ্ট নেই। রাস্তাটি পানি আর কাদায় মিশ্রিত থাকে সারাক্ষণ।
পথচারিদের চলাচল করতে হয় রিক্সা-টমটমের ফাঁকফোকর দিয়ে গা বাঁচিয়ে।
সেই পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হলেই কাদা কিছু কাপড়ে লা্গবেই। সবজি বিক্রেতা, মোদির দোকানী তাদের সকল পঁচাগলা-উচ্ছিষ্ঠ ও সকল বর্জ্য দোকানের সামনে ফেলাটা যেন ওদের অধিকার, নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই পঁচাগলা উচ্ছিষ্টের উপর দিয়ে ক্রেতাদের হাঁটাচলা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না !
এই শহরে সবচেয়ে বেশি যেটি দৃষ্টিকটু লাগে তাহলো: ডিসি অফিসের মুখে, পৌরসভার গেইট এলাকা। এটি হয়ে উঠেছে চারচাকার ভটভইট্রা গাড়ির এবং টেক্সির স্টেশন। কক্সবাজার জেলার সবচেয়ে দৃষ্টি-নন্দন ও যানজটমুক্ত স্থান হওয়া উচিত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মুখভাগ ও পৌরসভার গেইট এলাকা।
এই এলাকায় রয়েছে কক্সাবাজারের নাগরিক সমাজের ও শিল্প-সংস্কৃতির এবং রাজনৈতিক মহলের আনাগোনার অন্যতম কমিউনিট হল কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরি হল। কিন্ত প্রধান সড়ক থেকে ডিসি অফিস বা পৌরসভা অফিসের দিকে মোড় নিতেই যে কেউ দেখতে পাবেন সিএনজি সদৃশ ভটভইট্রা আওয়াজের গাড়ির ও সিএনজি টেক্সির স্টেশন।
অবাক করার বিষয় হলো, জেলা প্রশাসন ও কক্সবাজার পৌর প্রশাসনের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ অফিসের সামনে জনউৎপাত সৃষ্টিকারী এই ভটভইট্টা গাড়ির স্টেশনটি কিভাবে বহাল তবিয়তে চলছে ?
এ অবস্থায় জনউৎপাত সৃষ্টির জন্য দায়ী যত্রতত্র জিএনজি স্টেশন তুলে দিয়ে শহরের নানা প্রান্তে স্টেশনগুলো প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। বড় বাজার, পানবাজার রোড অথবা অন্য যেকোনো বাজারের দোকানের বর্জ্য রাস্তার উপর বা ফুটপাতে ফেললেই ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করে বাজারকে পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। এই শহররে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেই বললেই চলে। ট্রাফিক ব্যবস্থা উন্নত করতে আরো লোকবল নিয়োগ দেয়া আবশ্যক।
এই শহর পর্যটন শহর বলে- গৌরব করার কোনো অর্থ থাকে না, যদি-না এই শহরের সকলে শহরকে একটি উন্নত শহরের মানদন্ডে দেখার ও রাখার চেষ্টা না করা হয়। মানুষের বদ অভ্যাস দূর করতে এবং জনউৎপাত সৃষ্টিকারীকে দমন করতে নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ আবশ্যক, কিন্তু প্রয়োজনে অতি অবশ্যই বলপ্রয়োগ ও শাস্তি প্রদান অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে।







