আবদুর রশিদ সিদ্দিকী। নামটি নি:সন্দেহে এ প্রজন্মের কাছে অজানা, অচেনা। অনেকটা অশ্রুতই বলা যায়। সেটাই স্বাভাবিক। ৭৪ বছর আগেই তিনি ‘মরহুম’। তাঁকে নিয়ে কোথাও তেমন একটা আলোচনা বা চর্চাও নেই। বলা যায়, মানুষটি এখন অনেকটা বিস্মৃতপ্রায়। তাই এ প্রজন্মের কাছে নামটি একেবোরে নতুন ঠেকবে -সেটাই সঙ্গত। প্রকৃতপক্ষে তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম সাহিত্য ও সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব। একই সঙ্গে ভাষা গবেষক, রাজনীতিবিদ এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি একজন অগ্রগামী সৈনিক ও অন্যতম শীর্ষ কলম যোদ্ধা।
১৯১৯ সালে মাসিক পত্রিকা ‘সাধনা’ সম্পাদনা দিয়ে সিদ্দিকীর সাংবাদিক জীবনের যাত্রা। ওই পত্রিকায় লিখতেন রবীন্দ্র, নজরুলসহ তৎকালীন খ্যাতিমান সব কবি-সাহিত্যিক। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ কিছুকাল ওই পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ২ বছর পর ১৯২১ সালে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিচালনায় প্রকাশ পায় ভারতবর্ষের প্রথম মুসলিম নারী সম্পাদিত বাংলা পত্রিকা ‘আন্নেসা’। পত্রিকাটিতে সম্পাদক হিসেবে লেখা থাকত স্ত্রী সফিয়া খাতুনের নাম। কিন্তু কার্যত সিদ্দিকীই পত্রিকাটি সম্পাদনা ও পরিচালনা করতেন । পরবর্তী বছর ১৯২২ সালে তাঁর সম্পাদনায় কলকাতা থেকে প্রকাশ পায় বিখ্যাত পত্রিকা ‘মোসলেম জগত’। ব্রিটিশবিরোধী ভূমিকার জন্য পত্রিকাটি বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পায়। ওই পত্রিকায় ‘সময় থাকিতে সাবধান, বুঝে চল ব্রিটিশ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় নিবন্ধের জন্য তিনি বিটিশ সরকারের রোষানলে পড়েন এবং গ্রেপ্তার হন; যা ছিল ওই সময় ব্যাপক আলোচিত ঘটনা। পরবর্তীতে তাঁর সম্পাদনার তালিকায় যুক্ত হয় ‘সাপ্তাহিক রক্তকেতু’ ও‘সাপ্তাহিক কক্সবাজার হিতৈষী’ (কক্সবাজারের প্রথম পত্রিকা) ইত্যাদি পত্রিকা।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি গল্প, কবিতা, উপন্যাস, অনুবাদ ও রম্যরচনাসহ সাহিত্যের সব শাখায় ছিল সিদ্দিকীর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ২৮টি। তন্মধ্যে উপন্যাস- উপেন্দ্রনন্দিনী (১৯১৯), জরিনা (১৯২৬), প্রণয়-প্রদীপ, নুরুন্নেহার ও মেহেরুন্নেছা (১৯১৮); কাব্য- রোস্তম সোহরাব (১৯১৬), কলির বাঙ্গালা (১৯১৭), চিন্তার ফুল(১৯১৮) যবনবধ কাব্য (১৯৪৪) ও পাকিস্তান বিজয় কাব্য (১৯৪৮); পঞ্জিকা ‘মোসলেম জগৎ পঞ্জিকা (১৯৩৮) উল্লেখযোগ্য।
তাঁর রচিত ‘চট্টগ্রামী ভাষাতত্ত্ব (ব্যাকরণসংবলিত)’ (১৯৩৫) এবং ‘চট্টগ্রামের ভাষাতত্ত্ব, চট্টগ্রামী ও রোমাইতত্ত্ব’ গ্রন্থ দুটি ছিল চট্টগ্রামের ভাষার উপর রচিত প্রথম গবেষণা গ্রন্থ। বই দুটিতে তিনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার ভাষাতাত্ত্বিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। অন্যান্য গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ’উষাতারা’ (পৃথিবীর জীবনী), হিন্দু মোসলমান (ধর্ম সম্পর্কে তর্ক) ইত্যাদি।
তাঁর অনুদিত ‘মহা কোরআন কাব্য’ ছিল পবিত্র কুরআনের প্রথম কাব্যানুবাদ।
সিদ্দিকী ছিলেন প্রচন্ড রাজনীতি ও সমাজ সচেতন ব্যক্তিত্ব। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম ও লেখালেখির জন্যে তিনি তিন (৩) বার কারাবরণ করেন। তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী হয়ে কক্সবাজার আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
সিদ্দিকী একই সঙ্গে ব্যবসা ও সমাজসেবার সঙ্গেও প্রবলভাবে যুক্ত ছিলেন। ‘বেগম খোশ’ নামক একটি পেটেন্ট প্রাপ্ত ওষুধ বের করে তিনি প্রচুর বিত্ত-বৈভবের মালিক হন। অন্যদিকে গ্রাম রক্ষক সমিতি, পল্লী মঙ্গল সমিতি প্রতিষ্ঠাসহ বিচিত্র সমাজসেবা মূলক কর্মকান্ডের জন্য বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি স্বর্ণপদক লাভ করেন। (তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, বাংলা একাডেমী হতে প্রকাশিত জীবনী)
এই বিস্মৃতপ্রায় মনীষির জীবনের উপর বাংলা একাডেমী, ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে একাধিক জীবনী গ্রন্থ। তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রচুর গবেষণা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। হয়ত আগামীতেও হবে। মাত্র ৫৬ বছর আয়ু পাওয়া এই গুণী মানুষটির প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে গত বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে বিশেষ স্মারক গ্রন্থ : ‘আবদুর রশিদ সিদ্দিকী, বহুপ্রজ লেখক সাংবাদিক’। সম্পাদক-হুমায়ুন ছিদ্দিকী। লেখক:দেশের বিভিন্ন খ্যাতিমান লেখক ও গবেষক।
১৮৯৪ সালে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থানার কাকারা গ্রামে জন্ম নেয়া এই গুণী মানুষটি ১৯৫১ সালের ২৬ মার্চ মৃত্যু বরণ করেন। আজ তাঁর ৭৪ তম মৃত্যু বার্ষিকী।
contact: aftabragib2@gmail.com, 01843888867







