রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আরো দীর্ঘ মেয়াদি সমস্যা ও সংকট তৈরি করেছে মিয়ানমারের আভ্যান্তরীণ গৃহযুদ্ধ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে সাময়িক ভাবে রাখাইন রাজ্যসহ ৭ টি প্রদেশে মায়ানমার জান্তা সরকার বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নারী ধর্ষণ, শিক্ষার্থীদের বোমা মেরে হত্যা করে চরম বেকাদায় পড়েছে জান্তা বাহিনী। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা আফগানিস্তান ও জম্মু কাশ্মীরের অবস্থার দিকে মিয়ানমারের সার্বিক পরিস্থিতি। আর এ যুদ্ধের কারণে কক্সবাজার পর্যটন শিল্পে পড়েছে বিরূপ প্রভাব এবং সীমান্ত অঞ্চলে দেখা দিয়েছে চরম মানবিক বিপর্যয়।
ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু মিয়ানমারের জান্তা সরকারের কাছে এখন খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। এমনিতেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মায়ানমারের কোনো সময় ইতিবাচক মনোভাব ছিল না। জান্তা সরকারের পৃষ্টপোষক জঙ্গি সংগঠন আরসার কর্ম পরিধি ও দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। ফলে টান পড়েছে তাদের অর্থ ও গোলা ভান্ডারে। তাই অস্থির আরসা ক্যাডাররা বাংলাদেশীদের একের পর এক ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আদায় করছে মুক্তিপণ। আর শরণার্থী শিবিরে চালিয়ে যাচ্ছে ধারাবাহিক হত্যাকান্ড। হত্যাকান্ডের পেছনে রয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে অস্থির করে তোলা।
‘ প্রত্যাবাসনে অনীহা’ শব্দটি মাত্র তিন অক্ষরের। কিন্তু এই ক্ষেত্রে এই শব্দটির কারণেই বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বের সীমান্ত অঞ্চল অস্থির। বাংলাদেশের উপর ভয়াবহ চাপ তৈরি হয়েছে ১২ লক্ষ রোহিঙ্গার ভারে।
মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ২৭০ কিলোমিটার। উত্তরে রাঙ্গামাটির ধোপানীছড়া থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত দুর্গম পাহাড়, তারপর নাফ নদী ও সর্বশেষ দক্ষিণে সেন্টমার্টিন দ্বীপ পর্যন্ত সাগর সীমান্ত। পুরো সীমান্তই চ্যালেঞ্জিং।
এক সময় এই সীমান্তের একটি বড় অংশ ছিল অরক্ষিত। ধাপে ধাপে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। মিয়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিজিবি’র অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে মজবুত ও সুসংহত করেছে।
তবে সীমান্ত জুড়ে সাম্প্রতিক গুলাগুলি আর সংঘর্ষের সঙ্গে আগের ঘটনাগুলো মিলছে না। এই দফায় সীমান্ত পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ২০২২ সালের আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সীমান্ত বেশ অস্থির। ঘটছে নানা ঘটনা।
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে দেশটির বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মি। রাখাইন রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণে অগ্রসর হচ্ছে তারা।
সম্প্রতি রাখাইনের মাইয়ু নদীর পাশে বাউলি বাজার অবস্থিত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর একটি ব্যাটেলিয়ন দখলে নিয়েছে আরাকান আর্মি। সেখান থেকে লুট করেছে অস্ত্র। ৩২৫ ব্যাটেলিয়নের অবস্থান ভৌগলিক কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একটি ফেরি ঘাট রয়েছে।
নদী ও সড়ক পথ বিবেচনায় কৌশলগত কারণে এই সেনা ক্যাম্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সেনা ক্যাম্প বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে বেশি দূরে নয়। এছাড়া এই ঘটনার মধ্য দিয়ে শক্তি অর্জন করেছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি।
তারা একের পর এক দখল করছে দেশটির সেনা-বিজিপি ক্যাম্পসহ বিভিন্ন এলাকা। সেই সংঘর্ষ কখনো কখনো ঘটছে বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু-ঘুমদুম অঞ্চলের সীমান্তে দেড় মাস ধরে চলছে গুলাগুলি। মর্টারসহ আর্টিলারি শেল-এর বিকট শব্দে প্রকম্পিত হচ্ছে পুরো এলাকা। সীমান্তের ওপাশের সংঘর্ষের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ অংশেও।
শুরু থেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছেন গনমাধ্যম কর্মীরা। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্ত ঘুরে এসেছি একাধিক বার। শুরুতে পরিস্থিতি ছিল চরম ভয়াবহ। এ অবস্থায় সীমান্তবাসীদের মনে এখনো আতংক কাটেনি। গোলার শব্দ তাদের এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেছেন, ‘আমরা চরম আতংকের মধ্যে দিনাতিপাত করছি। যদিওবা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরী হয়নি এখনো। আগামী দিনে সীমান্তবাসীর ভাগ্যে কি লেখা আছে তা বলা মুশকিল।’ বিজিবি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয়রা ও নানাভাবে তথ্যউপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। সম্প্রতি জিরো লাইনে একজন রোহিঙ্গা মর্টারশেলের আঘাতে নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। একজন বাংলাদেশী উপজাতীয় যুবক গোলার আঘাতে পা হারিয়েছে। যুদ্ধ বিমান ও হেলিকপ্টার একাধিকবার সীমানা অতিক্রম করেছে। ওড়ানো হচ্ছে ড্রোন। সীমান্তে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বিজিবি।সীমান্ত সড়ক নির্মাণ কাজ বন্ধ করেছে বিজিবি।
এদিকে বিজিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মমায়ানমার জান্তা বাহিনীর এহেন আচরণের কড়া জবাব দেয়া হয়েছে। বিজিবি বিজিপির মধ্যে ইতিমধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান, বিজিবির এ কর্মকর্তা। অন্যদিকে কূটনীতিক পর্যায়ে ও এবিষয়ে চলছে দেন দরবার। মায়ানমার ভিত্তিক থাইল্যান্ডের গণমাধ্যম ইরাবতী প্রতিদিন মায়ানমারের যুদ্ধ পরিস্থিতির খবর ছাপিয়ে যাচ্ছে। ইরাবতী জানায়, দিনদিন নতুন নতুন এলাকা জান্তা বাহিনীর হাতছাড়া হচ্ছে। রাখাইনের মন্ডু, বুচিডং,চীন রাজ্যের সীমান্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার দখল নিতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে আরকান আর্মি।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অর্ধেকের ও বেশী রাজ্যের দখল এখন আরকান আর্মির হাতে চলে গেছে। গত দেড় মাস ধরে চলা যুদ্ধে আরকান আর্মি খুবই দক্ষতার সাথে সফলতা অর্জন করেছে। দুর্গম পাহাড়ী অঞ্চল থেকে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করছেন আরকান আর্মি। তাদের মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে জান্তা বাহিনী।
নাইক্ষ্যছড়ি থেকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত সীমান্ত এলাকার কথা হয় শতাধিক ব্যক্তির সাথে। তারা খুবই আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। মায়ানমারের ওপারে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছে মায়ানমার। যতটুকু জানা গেছে বাংলাদেশ আক্রমনে মায়ানমার সরকারের সে শক্তি সামর্থ্য নেই। ঘরের ভেতরের সংকট দূর করতে তারা এখন মরিয়া। বাংলাদেশ খুবই দক্ষতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। তার পরও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষকগণ।
এ সুযোগে মায়ানমার ও আরাকান আর্মি পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটানোর চেষ্টা হতে পারে বলে জানান নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অবঃ)ড. হাবিবুর রহমান।
এ দিকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে একটি বড় অংশ আরসার হয়ে গোপনে প্রকাশ্যে প্রত্যাবাসন বিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। তাদের কাজ হচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে অস্থির করে তোলা। উদেশ্য খুবই সহজ তা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের উপর পূর্ণ কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, আমরা চরম সংকটময় পরিস্থিতি পার করছি রোহিঙ্গাদের নিয়ে। এ অবস্থায় একজন রোহিঙ্গাও যাতে না ঢুকে সেই কঠোর নির্দেশনা দেয়া আছে বর্ড়ার গার্ড বাংলাদেশকে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কড়া নির্দেশ কোন নতুন রোহিঙ্গার দায়িত্ব বাংলাদেশ নেবেনা। যারা আছে তাদের নিয়ে সরকার ও দেশবাসী খুবই উদ্বিগ্ন।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, মায়ানমার যুদ্ধ পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সংকট কক্সবাজার পর্যটন শিল্পের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কক্সবাজারের সার্বিক অর্থনীতি শুধুমাত্র রোহিঙ্গাদের কারণে ব্যাপক ক্ষতির সম্মূখীন। তিনি আরো বলেন, মায়ানমার সীমান্তে উত্তপ্ত যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইতিমধ্যে আমাদের সীমান্ত বাসীরা উদ্বেগ, উৎকন্ঠায় কঠিন সময় পার করছে। নাফ নদীতে মাছ ধরতে জেলেরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে যেতে পারছে না। চাষাবাদের শতশত একর জমি পড়ে আছে অনাবাদী। ফলে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে বিশেষ করে নাইক্ষ্যং ছড়ি, উখিয়া ও টেকনাফে।







