আধুনিক কবিতা বিংশ শতাব্দীর বাঙলা সাহিত্যের বৃহত্তম ঘটনা। আধুনিক কবিতার বিশাল পথ ধরে বিংশ শতাব্দী প্রবেশ করেছে বাঙলা ও বাঙ্গালীর মনচিত্রে। বিংশ শতাব্দীর বাঙলা সাহিত্যের পা হতে মাথার চুল পর্যন্ত একা কিন্তু আধুনিক নয়। তার একটি অংশ মধ্যযুগ। আরো একটি অংশ ঊনিশ শতক, তার ছোট্ট এক চিলতে উঠান আধুনিক বিশ শতক। বাঙালীর সাহিত্য-সমাজ এবঙ সংস্কারে এ কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। চেতনার ক্ষেত্রে আমরা আধুনিক হলেও কালের ক্ষেত্রে অনেক দূরে আমাদের অবস্থান। এ কথা সমগ্র বাঙলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে যেমন সত্যি তেমনি কক্সবাজারের সাহিত্যের ক্ষেত্রে ও সমান ভাবে খাটে।
এ কথা অবশ্যই সত্যি যে বিংশ শতাব্দীর মনন ও চর্চা কক্সবাজারের রূপ চিত্রে প্রবেশ করেছে আরো পরে। ঊনিশ শতাব্দীর বিলম্বিত উপহার হিসাবেই আমরা বিংশ শতাব্দীকে অনেক পরে মনচিত্রে ধারণ করেছি। এইতো কক্সবাজার জেলায় রূপান্তরিত হওয়ার সময়টুকু বেশি দূরের নয়।
আমরা আধুনিক হয়েছি ধীরে ধীরে-কি মননে, কি মেধায়- কখনও ব্যক্তিগতভাবে, কখনো নৈর্ব্যক্তিক। একই সময়ে আমরা আধুনিক হয়ে বেড়ে যেমন উঠিনি, তেমনি চিন্তায় চেতনাতেও আধুনিকতার ছোয়াঁ এসেছে ধীরে।
১৮৫৪ সালে কক্সবাজার মহকুমায় পরিনত হয়। শহরটাকে পৌরসভার মর্যাদা দেয়া হয়-১৮৬৯ সালে। এ সময়ে এখানে মুদ্রন শিল্পের গোড়া পত্তন হয়নি। ১০০ বছরের অধিক সময় পার করে ১৯৭৮ সালে কক্সবাজারে সংবাদ পত্র প্রকাশ হতে থাকে। ছাপার অক্ষরে সংবাদ পত্র প্রকাশিত না হলেও এখানে দু’জন তরুণের উদ্যোগে অনিয়মিত পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল।
১৯৪৭ সালে শহীদ সাবের, আব্দুল হাকিম প্রমুখ তরুণের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটি হাতে লিখা সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ হতে থাকে, ৩টি সংখ্যা মাত্রা প্রকাশিত হয়ে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়, পত্রিকাটি একজন পড়ে অন্যজনকে দিত। পত্রিকার নাম ‘জাগরণ’।
কক্সবাজারের সাহিত্য সংকলনের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে সংকলনটি প্রকাশিত হতো মফস্বল ঈদগাঁও থেকে। সনটি হচ্ছে ১৯৬৫ইংরেজী। ঈদগাঁওতে সাহিত্যের একটি চর্চা আমরা লক্ষ্য করি। একদল তরুণ সাহিত্য চর্চার এই চারা গাছটিতে জল সেচ দিয়ে তাজা করে রাখে। গাছটির নতুন নাম করণ করা হয় ‘ঊর্মি মালা সাহিত্য সংসদ’। এখানে একটি পাঠাগার ও প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা প্রকাশ করে ‘কলতান’। সম্ভবত ‘কলতান’-ই কক্সবাজারের প্রথম আধুনিক প্রকাশনা। আর এই সাহিত্য পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা।
বর্তমান আলোচনাটি সমগ্র কক্সবাজার জেলাকে কেন্দ্র করে। এ যাবৎ কক্সবাজারের কবিদের যে সমস্ত প্রাচীনতম সাহিত্য নিদর্শন কাব্যগ্রন্থ ও পুথি সাহিত্য আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে তা যথাক্রমে কবি নসরুল্লাহ খার (১৫৬০) (১) জঙ্গনামা (২) মুসার সওয়াল (৩) শরীয়ত নামা (৪) হিদায়াতুল ইসলাম। কবি তমিজীর ‘লালমতি’ ‘তাজুল মলুক’ কবি হাজী আলীর ‘মওত নামা’ (খন্ডিত পুঁথি) কবি লোকমান আলীর ‘হাদীস কালাম বাণী’ কবি মৌলানা আব্দুল আলীর (১৬শ শতাব্দী) ‘উপদেশ সন্দেশ’ (কবি শেখ সাদীর পন্দে নামার অনুবাদ), কবি মুজিবুল্লাহের (১৭শ শতাব্দী) ‘প্রেমোদ্যান’ (হিন্দি কবি হাসানের-গোলজার ইব্রাহিমের অনুবাদ)।
প্রেমোদ্যানের যে কপিটি পাওয়া গেছে তার সমানের দু’টি ও শেষের দিকে অনেক পৃষ্ঠা ছিড়া। ছেড়া পাতায় সম্ভবত কবির পরিচয় ছিল। কবি আলহাজ্ব আমীর মুহাম্মদ সিকদারের (১৮৬৫) ‘আদর্শ হেজাজ ভ্রমন’ কবি মওলানা মোজাহেরুল হক চৌধুরীর (১৮৬৯) ‘পরকালের ভাবনা’, কবি নতুন চন্দ্র দের (১৮৮২) ‘সাধন সঙ্গীত’। কবি-সাহিত্যিক সাংবাদিক রাজনীতিক চকরিয়ার আব্দুর রশিদ সিদ্দিকীর (১৮৯৪) (১) ‘রুস্তম সোহরাব’ (২) মহাকোরান (৩) যবন বধ কাব্য (৪) চিত্ত দর্পন (৫) কলির বাঙলা (৫) পাকিস্তান বিজয় কাব্য (৭) পাকিস্তান বিজয় কবিতা (৮) চিন্তার ফুল।
কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা (১) শোনিতে সমুদ্র পাত (২) আমার সশস্ত্র শব্দ বাহিনী (৩) শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি (৪) অগ্নিময়ী হে মৃন্ময়ী (৫) আমরা তামাটে জাতি (৬) শুক্লা শকুন্তলা (৭) যিসাস মুজিব (৮) নির্বাচিত কবিতা। ১৩৯০ ও ১৩৯১ বাঙলায় সম্পাদিত ইংরেজি সাহিত্য সংকলন চঙঊওগঅ ইত্যাদি। কবি সলিম উল্লাহ খানের ‘এক আকাশের স্বপ্ন’ কবি রুহুল কাদের বাবুল ও কবি মির্জা মনোয়ার হাসানের যুগল সংকলন ‘সমুদ্রের উল্টো দিকে যাত্রা’।
কবি অমিত চৌধুরীর ‘চোখ রেখেছি তোমার চোখে’, এ ছাড়া কবি সাংবাদিক এ.কে.এম শহীদুল্লাহ প্রকাশ শহীদ সাবের ও একজন আলোচিত কবি হিসাবে চিহিৃত। বাঙলা একাডেমি ‘শহীদ সাবের রচনাবলী’ প্রকাশ করেছেন। তার ‘শোকার্ত-মায়ের প্রতি’ একটি উল্লেখযোগ্য কবিতা।
‘শোকার্ত মায়ের প্রতি’ কবিতাটি তিনি চট্টগ্রাম সেন্ট্রাল জেলে বসেই রচনা করেন। কবিতাটি ইলামিত্রের গ্রেফতার এবঙ তার উপর নির্যাতনের প্রেক্ষিতে রচিত। ইলামিত্রের গ্রেফতারের পর মুসলিম লীগ সরকার তার উপর যে নির্যাতন চালায় তখনকার সময়ে তা কিংবদন্তীতে রূপান্তরিত হয়। এ কবিতা শহীদ সাবেরের প্রানের প্রচন্ড আবেগে রচিত। মূলত; কবিতার লাইনে লাইনে শহীদ সাবেরের আত্নাকে স্পর্শ করার মতো-
মাগো ক্যাপ্টেন ভের্ণের কি বুঝবে বলো
কেন তুমি যোগ দিয়েছ গেরিলা দলে
স্বদেশ প্রেমের আগুন কত জ্বলে
পররাজ্য লোভী নাৎসীরা কি বুঝবে তা
বাংলাদেশের নুরুল পীড়িত
তুমি অলগা ইলামাতা
তোমার জবান বন্দী এসেছে হাতে।
(শহীদ সাবের রচনাবলী/সেলিনা হোসেন সম্পাদিত)
কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা কক্সবাজারের অতীত এবঙ এসময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একজন কবি কক্সবাজারের কাব্য মান চিত্রে তিনিই একমাত্র রূপকুশলী কবি যিনি অতীত এবঙ বর্তমানের ঐতিহ্য কে একই করপুটে ধারণ করে কক্সবাজারের সাহিত্যকে ধন্য করেছেন তিনি তার মতই। কক্সবাজারের বিশাল কাব্য আকাশে তিনি একমাত্র পূর্ন চাঁদ। এ সত্য পুরো বাঙলা দেশের ক্ষেত্রেও সংলগ্নতা রাখে বৈকি!
কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা একজন ক্লাসিক কবি। তার বিভিন্ন কাব্যে একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য পরিচিহিৃত ও বটে। তার কাব্য বৈশিষ্টকে পরিচিহিৃত করার জন্য আরো বিস্তারিত অনুসন্ধান সংযুক্তি দেয়া হলো-
ফুলের আলোচনা ক্ষান্ত কর
বুলবুলের আলোচনা হোক আজ
এই বুলবুল ফুলের বিচ্ছেদ যাতনায়
নিয়ত কাতর থাকে॥
কবি নুরুল হুদা ফুলের কবি, পাখির কবি।
কবি নুরুল হুদা কাব্য বাগানের বুলবুল। আজ তাঁর জন্ম দিবস। তাঁকে ঘিরেই আলোচনা। কাব্য ফুলের আলোচনা ক্ষান্ত থাকবে তাঁর ৭৪ তম জন্ম দিন আজ। কবিকে স্বাগতম।
মূলত: কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা কাব্য ভুবনের মৌমাছি। তিনি মৌমাছির মত সঞ্চয়ী, পরিশ্রমি, কৃপন এবঙ স্বার্থপরও বটেন। কবি নুরুল হুদা মৌমাছির মত কাব্য মধু তালাসেও অস্থির। যেন অস্থির মৌমাছি। তিনি কাব্য বাগানের কাছাকাছি থাকেন অথবা কাব্য বাগানের ফুলে ফুলে বিচরণ করেন। যেন সে মধু লোভী মৌমাছি। তিনি মধুকর। মৌমাছি মৌচাকে “প্রকোষ্টের পর প্রকোষ্টে মধু সঞ্চয়ে তৎপর। মৌমাছি তাঁর সঞ্চিত মধু নিজের জন্য সঞ্চয় করে ও তা পানাহারে বেঁচে থাকে।
কবি নুরুল হুদা ও তাই। তবে তিনি কিঞ্চিত ব্যতিক্রমও বটে। কবি নুরুল হুদা ও বাঙলা সাহিত্যের কাব্য মৌচাকে নিজের জন্য এবঙ কাব্য মধুলোভী পাঠকের জন্য মধু সঞ্চয় করেছেন, শুধু নিজের জন্য কাব্য মধু সংরক্ষণে তিনি আগ্রহী নন।
প্রকৃতির মৌমাছিরা নিজের সঞ্চিত মধু এবঙ মৌচাক রক্ষার জন্য ভয়ঙ্কর ভূমিকা রাখে। মধু লোভী জীবের হাত হতে মৌচাক এবঙ সঞ্চিত মধু রক্ষা করতে যেয়ে মৌমাছি হামলাকারীকে তীব্র আক্রমন করতে দ্বিধা করে না। কবি নুরুল হুদা এক্ষেত্রেও কিঞ্চিত ব্যতিক্রম বটে।
কাব্যমধু লোভী সে সমস্ত পাঠকের কাছেই তিনি তাঁর কাব্য মৌছাক উন্মুক্ত করেন। যারা রূপার চেয়ে রূপকে, রূপের চেয়ে গুনকে এবঙ গুনের চেয়ে বুদ্ধির মুুখাপেক্ষী। তিনি তাদের কাছেই উপভোগ্য এবঙ উপলদ্ধির বিষয় হয়ে ওঠেন। অন্যরা হতাশ হন। তারা নিরাশ ও হন এবঙ কাব্য হুলের যন্ত্রনায় ছট্ ফট্ করেন। এ জন্যই তিনি মক্ষিকা সহোদরও বটে॥
বাঙলা সাহিত্যের কাব্য মৌচাকে কবি নুরুল হুদার ছিয়াশিটির মত প্রকোষ্ঠ রয়েছে। এ প্রকোষ্ঠ গুলিতে কাব্য মধু সঞ্চিত হয়েই আছে। কবি নুরুল হুদা প্রকোষ্ঠ গুলি উন্মুক্ত রাখেন। তাঁদের জন্য, যারা সমজদার এবঙ তাঁর স্বগোত্রীয়। তাঁরা কাব্য মৌমাছি ও হন। তাঁর ছিয়াশিটি প্রকোষ্ঠ মধুরূপী দরিয়াও! এ দরিয়ায় হাজার মন মধু ঢাললেও এটি ভরে না। হাজার মন কাব্য মধু সেখান হতে তুলে নিলেও কমতি পড়ে না। এ মধু রূপী দরিয়ার ঘাটে বাঁধা দেখি কবি নুরুল হুদার অলৌকিক নৌকা। মধুভর্তি এ দরিয়ায় সূর্য নাই। কবির এ কাব্য দরিয়া চন্দ্র শাসিত। কবির এ মধুরূপী দরিয়ায় আকাশে চন্দ্র একা ও নি:সঙ্গ। একে বারে ইশ্বরের মত নি:সঙ্গ। এ নি:সঙ্গতা কবির জীবনে দিনের মত সত্য। এ চন্দ্রের উপমা চন্দ্র নিজেই। কবির উপমা কবি নিজেই। কাব্য জগতের এ দরিয়ায় আকাশের এ চন্দ্র পূর্ণ চন্দ্র। এ পূর্ণ চন্দ্র অস্তমিত হয় না। এখানে দিন রাত্রি নাই। জোছনার প্লাবন কবির কাব্য দরিয়া জুড়ে। জোছনার প্লাবনের সাথে মধুভর্তি সে সাগরেও জোয়ার উপছে উঠে। কবি নিজে আপন মনে বলে উঠেন-
দরিয়াকে বসিয়ে রেখে আমি ছুঁটে ছুঁটে যাই মন দরিয়ায়/দরিয়া হাসফাস করে, নড়ে চড়ে, সিংহীর মত গর্জন করে/আমার বুকের শেকড় উপড়ে ফেলার জন্য নখর মেলে ধরে/আমি তেমন গা করি না/আমি আমার বাঁধন আলগা করি না/আমি পিষে ফেলি তার তরঙ্গ স্তন/আমি আমার খুঁটি হতে সরি না/দরিয়ার সঙ্গে।
কবি সেই জোছনা স্নাত হয়ে তাঁর আলৌকিক নৌকাতেই খুঁটি ধরে বসে থাকেন। তাঁর নৌকা কাব্য ভুবনের মধু লোভী যাত্রী মৌমাছি দিয়ে ও ভর্তি হয় না। তাঁর নৌকার প্রকৃতি ও দরিয়ার মত। দিলেও ভরে না। নিলেও কমে না। কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা এখানে আর জাতি সত্ত্বার কবি থাকেন না। তিনি অবলীলায় হয়ে ওঠেন একান্তই মানব সত্ত্বার কবি।
এ মানব কিন্তু বিশ্বমানব। এ মানব মনসুর হেল্লাজের মত হঠাৎ এবঙ অনায়াসে বলে ফেল্তে পারেন ‘আনাল হক’। এ জন্য তাঁর শাস্তি ও শিরোধার্য হয়ে উঠতে পারে। নুরুল হুদা সেই শাস্তি এবঙ অনন্ত যাত্রার পথকে কি তৈরী করে নিচ্ছেন! তাঁর ঘাটে বসেই, সেই বিশাল বিদর্শন কবিকে জ্যোতির্ময় সত্তার সাথেই কি সম্মিলন ঘটাবে! এজন্যে আমার নিজের কবিতার একটি উদ্ধৃতি টানার লোভ সামলাতে পারছিনা-
সে শুধু সে একজন
সে শুধু সাধু এবঙ সন্তদের
আত্নার জায়নামাজ
হে দরবেশ, তুমি বৃষ্টি
হে বৃষ্টি তুমি দরবেশ
হে কবি, তুমি বৃষ্টি, তুমি দরবেশ॥
কবি কামেলে ইনসানের মতই বলেছেন, ‘কোটি বর্ষ আছি সূর্যের সিনায়’ (কবি চূড়া)। কিন্তু কবির আনন্দময় অনন্ত স্নান যে জোছনায়। এ কথা অস্বীকার করবে কে? স্নানরত অবস্থায় কবি দর্শন করেন তাবৎ ঘরে ঘরে-
‘ঘরে ঘরে চাঁদের কামিজ গায়ে
দরিয়া মানবী’
(দরিয়া শিশু)
এ কবি ‘রূহের মৌচাক’ ফেলে কোথাও যেতে নারাজ। কবি এখানে স্রষ্টার দেয়া বিশাল শক্তির সন্ধান পেয়ে যান অনায়াসে। এ কারনেই তিনি অনায়াসে অনাসক্ত হয়ে ওঠেন জাগতিক কামনা বাসনার প্রতি। সম্ভববত ইমাম গাজ্জালীর দর্শনে আস্থাশীল হয়ে ওঠেন কবি অনায়াসে। ইমাম গাজ্জালীর কাছে মনুষ্য খাকটি বাজারের থলের মতই মূল্যহীন।
কবি নাগরিক জীবনে অভ্যস্থ কি? আমি তো মনে করি তিনি না নাগরিক, না গৃহস্থ। তিনি গৃহী সন্ন্যাসী। তাঁর কবিতায় তিনি নিয়ন্ত্রিত সুখের কথা বলেছেন। সুফীরা নিয়ন্ত্রিত সুখের জন্য কাতর হয়ে পড়েন। কবি বলেন-
‘আমি চাই নিয়ন্ত্রিত সুখ/গৃহস্থের পাখিগুলি আকাশে উড়ুক।’/বাধা ধরা জীবন এ কবির জন্য নয়। শহুরে নাগরিক জীবনের প্রতি কবি তো রীতিমত থুথু দিতে প্রস্তুত। কবি বলেই ফেলেন- ‘আমার থুথুর বন্যায়/একবার ভেসে যেতে যদি’।/
কবি নুরুল হুদার প্রেমের স্বরূপ কি? জাগতিক প্রেমের মাথার উপর পা রেখে তিনি জ্যোতির্ময় প্রেমের প্রত্যাশী। কবির সে জ্যোতির্ময় প্রেমের জগতে স্ত্রী পুত্র কন্যা অনুপস্থিত। তাঁর এ প্রেমের কোন অংশীদার নাই। কবি বলেন-
শব্দের জগৎ থেকে নির্বাসিত
দৃশ্যের জগৎ থেকে নির্বাসিত
এ আমাকে-
কে তুমি নিচ্ছো টেনে
অস্তিত্বের অনঢ়-অতলে॥
সে বিশাল অস্তিত্বের প্রেমেই তিনি নিমগ্ন/ সে বিশাল অস্তিত্বের সত্ত্বাকেই তিনি অনুবাদ করেছেন
কবিতার পর কবিতায়।
ইব্রাহিম বিন আদহামের মতই তিনি সবকিছু ছেড়ে যেতে চান। আমার মন বলছে, তাঁর প্রেমের দরজায় জাগতিক সত্ত্বার কোন অস্তিত্ব আদৌ নাই।
কবি নুরুল হুদা পিপঁড়া সদৃশ/ পিপঁড়াকূল সারি বদ্ধভাবে চলা চল করে। একটির পিছনে অন্যটি চলে। পিপঁড়া চলার সময় মাটিতে লালা লাগিয়ে লাগিয়ে যায়। পিছনের পিপঁড়া আগের পিপঁড়ার রেখে যাওয়া লালার গন্ধ শুকে শুকে সারি রক্ষা করে। সামনে চলে। কেউ সে লালা মুছে দিলে পিপঁড়ার সারি ভেঙ্গে যায়। কবি নুরুল হুদা পিপঁড়া চলনে অভ্যস্থ বলে মনে হয়। কবি নুরুল হুদা পূর্বসূরী অগ্রবর্তীগনের ঐতিহ্য অনুসরণ করেই তাঁর কাব্য ভুবনে রচনা করেছেন। তাঁর কাব্যের কবিতায় বাঙলা কাব্যের প্রাচীন ঐতিহ্য খিল খিল করে হেসে উঠতে দেখি, পিপঁড়ার মত তিনি, সারি বদ্ধ হয়ে চলছেন। এবঙ লালা রূপী ঐতিহ্যের গন্ধ শুঁকে শুঁকে অগ্রসর হয়ে চলেছেন। বাঙলা কাব্য সাহিত্যে তিনি গ্রামীন ও লোকজ ঐতিহ্যের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী হন। একই সাথে তিনি পিপঁড়া সহোদর ও হন।
এখন প্রশ্ন আসে তিনি কেমন মানুষ? মন বলছে- তিনি অতি সাধারণ মানুষ। তিনি হোমিওপ্যাথির মানুষ। হোমিওপ্যাথির ডাক্তার এবঙ রোগী উভয়েই সাধারণ মানুষ। একে বারেই অতি সাধারণ। হোমিওপ্যাথির ঔষধটাই হচ্ছে অসাধারণ। অনু দিয়ে তার তৃষ্ণা মিটে না। পরমানুতেই তার নিবৃত্তি। দর্শনে তাঁর তৃষ্ণা মিটেনা। বিদর্শনেই তার মুক্তি এবঙ নিবৃত্তি। সাধারণ হওয়া সত্যি অসম্ভব কঠিন। বিত্তবান হওয়া সহজ। বিত্ত অর্জন সহজ। বিত্ত বেসাতি করে-লুটপাট করে-রাতা রাতি অসাধারণ হওয়া সহজ। চমকে দেয়া সহজ।
এটি স্থ’ূল অর্থে অসাধারণ। হোমিওপ্যাথিতে অনু ভেঙ্গে পরমানু তৈরী হয়। বিশাল সূক্ষ শক্তির উম্মেষ ঘটে। সে শক্তিই অসাধারণ। এ শক্তি অক্ষয়। এ শক্তির লয় নাই। ক্ষয় নাই। শিশিতে থাকলেও ক্ষয় নাই। দীঘিতে থাকলেও ক্ষয় নাই। সাগরে মিশে গেলেও ক্ষয় নাই। অসাধারণত্ব বলে তাকেই!
একজন দরবেশকে জানি যিনি বিচারিক আদালতে পাখা টানতেন। তাঁর সত্ত্বা পরমানু সদৃশ পরমাত্নায় মিশে ছিল। তিনি সাধারণ হতে হতে অসাধারণ হয়েছিলেন। আমি এই দরবেশের কবরের পারে অনেক বিত্তওয়ালা অসাধারণ মানুষকে কান্নারত দেখেছি। সিদ্ধার্থ রাজপুত্র হয়ে অসাধারণ ছিলেন। সে অসাধারণে তাঁর তৃষ্ণা মিটে না। তিনি গৌতম হলেন অতপর বৌদ্ধ হলেন। জাগতিক অসাধারনত্বে তাঁর তৃপ্তি নাই। তিনি সেটি পরিত্যাগ করে- সাধারণ পথেই পা বাড়ালেন। সাধারণ হতে হতে, সূক্ষ হতে হতে, অনু হতে হতে, তিনি পরমানুতে পৌছে-হয়ে উঠেছেন। ভগবান বুদ্ধ। কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা তিনি নিজকে ছিয়াশি বার ছিয়াশি ভাবে ভেঙ্গেছেন। প্রতিবারেই তিনি সাধারণের দিকেই যাত্রা করেছেন। এক মনজিলের পর আরেক মনজিল। তার প্রত্যেকটি মনজিল আলাদা বিভা সমৃদ্ধ-শক্তির প্রাচুর্যে অসাধারণ, তিনিও অসাধারণ। কাব্য ভুবনের বরপুত্র তিনি।
কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদার সময়ের দৈর্ঘ্য প্রস্ত কি রূপ? তিনি মহাকালের যাত্রী! কাল কি রূপ? পৃথিবীর সৃষ্টি হতে শেষ অবধি তিনটি কাল। তিনটি দেয়াল। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের এই দেয়াল গুলি কবি নুরুল হুদার সময়ের মহাকালে অনুপস্থিত। মহাজাগতিক কালের সাথে তাঁর মহাকাল স্থিত হয়। তাঁর সময় স্থির এবঙ অচঞ্চল। এ কারনেই বুদ্ধদেবের কাল হতে তিনি অবলীলায় ফেরাউনের সাম্রাজ্যে বিচরন করতে পারেন। কালের খেয়া তাঁর পদতলে অলৌকিক মহিমায় দাঁড়িয়ে থাকে। আমি আমার কবিতা দিয়েই শেষ করতে চাই। কবির প্রতি অর্ঘ্য-
পৃথিবীর দৈর্ঘ্য প্রস্ত যাই হোক
ভয় কেন! ভয় নাই
যে আকার চাঁন, তাই হবে
যে প্রকৃতি চান, তাই হবে।
উচ্চতায় চাঁদের সমান
আকাশ প্রমান
জোছনার ঘর বাড়ি
জোছনার পাখি গুলি কার?
রাতভর যারা কাঁদে
আনত ভঙিগতে
আর গজল বানায়
পাখি গুলি তার!
(হে দরবেশ, তুমি বৃষ্টি
হে বৃষ্টি, তুমি দরবেশ)
কবি অধ্যাপক মুফিদুল আলম রাজনীতিবিদ। তার কবিতার বই প্রকাশিত হয়নি। তবে ছন্দ সচেতন এই ব্যক্তি কবিতার মাঝে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। উর্দু কাব্য অনুবাদ ‘লখতে খয়াল’ তার মৃত্যুর কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়।
কবি অমিত চৌধুরী, সুজিত বড়ুয়া, সিরাজুল হক, নুরুল আবছার, রুহুল কাদের বাবুল, আতাহার ইকবাল, আহমদ উল্লাহ, মির্জা মনোয়ার হাসান, মঈনউদ্দিন, এহেসানুল হক কাজল, মিনার চৌধুরী, আহমেদ রায়হান, খালিদ আহসান, জসিম উদ্দিন বকুল, বিশ্বজিৎ সেন, জয়নাল আবেদীন মুকুলের লেখায় যথেষ্ট সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে।
কক্সবাজারের মহিলা কবিরাও পিছিয়ে নেই- ফাতেমা খাতুন মনো, হাসিনা চৌধুরী লিলি, আফরোজা কামাল মেরু, খালেদা খানম পুতুলসহ জনাকয়েকের নাম উল্লেখযোগ্য। হাসিনা চৌধুরী লিলির কবিতায় সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের চেষ্টা লক্ষনীয়। লিলি তার ‘অহনও কাঁন্দে সখিনারা’ এবং ‘হাউসেঁর হাঁসুলি’ কবিতাতে সে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ‘সমুদ্রের শব্দ’ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। অতি সম্প্রতি এই ধারাতে যুক্ত হয়েছেন শামিম আক্তার, ‘বিবর্ণ প্রজাপতি’ (২০০৩) তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ তিনি প্রতিনিয়ত নিজের মনচিত্রের উপর নতুন নতুন রঙতুলি ব্যবহার করছেন।
কক্সবাজার জেলার শিল্প সাহিত্য সেবীরা জানেন যে, ৬৫ সালের কিঞ্চিত পর কক্সবাজারের কবিতার মেঠো পথটি আধুনিকতার সদর রাজপথের সাথে সংযুক্ত হতে দেখা যায়। কালিক হিসেবে ৯০ এর দশকে কক্সবাজারের যে সব তরুণ কবি কবিতা লিখেছেন তাঁদের কবিতার মননে ও মেজাজে রয়েছে এক ধরনের প্রাণবন্ত যৌবন আর দার্ঢ্য স্টাইল।
এ কারণেই সম্ভবত: বাংলাদেশের অপরাপর এলাকার কবি কর্মীদের চেয়ে তাদের পৃথক করা সহজ। তাদের কবিতায় কক্সবাজারের নিসর্গ জয়গান স্বত:স্ফুর্ত ও অবারিত। মূলত: নব্বই দশকের এ অঞ্চলের কবি কুলের যাত্রা নদীর আদ্যগতিতে খরস্রোতা কিংবা স্থির নয়, কিংবা মধ্যগতির মন্ত্রতায় নিঃশেষিতও নয়, বরং প্রান্তিক বা শেষ গতির বিশালতায় ভরপুর। এ বিশালতা ক্ষুদ্র অর্থে সাগরের সাথে নদীর তুল্যতাকে উপমা হিসেবে দাঁড় করায়। অথবা বলা চলে সাল ও কাল উত্তীর্ণ হয়ে মহাকালের সম্পদ হয়ে উঠার যে আকুতি, সে আকুতি নব্বই দশকের আলোচিত এ সকল কবির কবিতায় বহুল ভাবে বর্তমান আছে।
অবশ্য আলী প্রয়াস দশকের বন্ধনীতে কবি ও কবিতাকে যদিও আটকে ফেলার জন্য আমাকে অনুরোধ করেছেন, তথাপি সাহিত্যের বোদ্ধা পাঠক মাত্রই জানেন- কোন ভাল ও শিল্পমান সম্পন্ন কবিতা দশকের বন্ধনীতে আবদ্ধ হতে পারে না। তার যাত্রা মহাকালের দিকে। একারণেই মহাকালের কথা বলতে গিয়ে নদী ও সাগরের চেয়ে ভাল কোন উদাহরণ এ মুহুর্তে আমার হাতে নেই। বিষয়টি পাঠকের স্মরণে রাখার জন্য বিনীত অনুরোধ জ্ঞাপন করছি।
আমি বলছি কক্সবাজার জেলার ছয় জন তরুণ কবির লেখা এ মুহুর্তে আমার হাতে রয়েছে। তাদের উত্থান, কালিক হিসেবে নব্বই দশকে। এ ছয় জন তরুণ কবির মধ্যে পাঁচ জনের কাব্যগ্রন্থ ইতোমধ্যে প্রকাশিতও হয়েছে।
খালেদ মাহবুব মোর্শেদঃ রূপালী ডানায় সোনালী ঝিলিক
কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদ তাঁর কবিতায় রূপার ধাতু মূল্যকে উপেক্ষা করে, রূপের দ্যুতিতে ক্ষণিক ও আপাত ইতস্তত মনে হলেও বোধির সর্বোচ্চ শিখরে মনুষ্যত্বের স্বর্ণমূল্য অন্বেষণ করেন। তাঁর প্রায় কবিতাতেই তিনি স্থির অনুঃধ্যানে আত্মস্থ হয়ে বাণীর প্রতি হয়েছেন সমর্পিত। আমি তাঁকে স্বরস্বতীর বরপুত্র বলতে চাই।
তার সমর্পিত বাণীতে-
খেলি পার্থিব আলোর খেলা। জমাট আড্ডায় পকেট উজাড়:
সঘন সবুজ বনপথে কে ওই পথিক, কে গো-
দ্রোহী মনসুর হল্লাজের অসীম বোধির প্ররোচনা পেয়ে
কে ওই শোনায় তান, মাতোয়ারা জিকিরে ‘আনাল হক’:
আমিই সত্য
(ইলাহের খোঁজে)
আরো একটি অসাধারণ উদাহরণ আমরা দিতে পারি। যেমন– এই জলরাশি, এই তুমুল সফেন ঊর্মিমালা/ বুকে করে চলে যাবো গহীন অরণ্যে/পেয়ালায় ভরে নেবো সব অন্তর্জালা/ তমসা লোপ হয়ে শরীরের ছায়া/মেনকার ঘর হতে বেরুবো আদিম/ফেরারী খোলাস ছেড়ে মেলবো পেখম/বালুকায় মুছে যাবে দু’পায়ের মায়া। (ফের ফেরারী মৌসুম)
মাহবুব মোর্শেদ একই সাথে ইতিহাস সচেতন কবি হিসেবেও নিজকে কবিতায় উপস্থাপন করেন। রূপকের মধ্যে দিয়ে তিনি সময়ের দূরতম সম্পর্ককেও নির্দেশ করে দেন, যেমন–সকলই বিফল/ সময়ের ধারাপাতে অগুনিত তুচ্ছ ফলাফল/ একদা এভাবে জ্ঞান বুড়ো কার্ল মাক্স ইতিহাস হয়ে গেলে/ সকলে বুঝতে পারে, সামান্য পালকও কত ভার! (সামান্য পালক)
কবি খালেদ মাহবুব মোর্শেদ আত্মমগ্ন কবি ও ব্যক্তি। তার কবিতার মানচিত্রে বাস্তবতা নাই। কিন্তু তিনি তার কবিতা ও কাব্যে অসাধারণ দ্যুতিময় সত্যকে বর্ণময় ভাবে উপস্থাপন করেন। যেমন– পাতা থেকে কান্ড চেয়ে সর্বশেকড়তক ছড়ায় প্রাণানুরাগের দ্যুতি/ জানি, বিরহই সার! সে নদীর বাতাসে কেন যে খুঁজি প্রশান্তির ছায়া/ কেন চাই সকল ভরসা! দু’বাহু কেবল প্রসারিত রাখি সমুখে-পেছনে। (পান পাতা)
তাঁর চিত্র কল্প আরো চমৎকার এবং উল্লেখযোগ্য– কুয়াশায় রাত জেগে কাকভেজা ঘাসের আগায়/ রহস্যের রূপচাঁদা ভিজে আছে সফেন বিভায়/ এ দৃশ্যে অভ্যস্ত চাঁদ মৃদু হেসে শোনায় সিস্ফনি। (জলের জানালা)
কবি নিজের ভিতর নিজকে দেখেন।
তিনি নিজের ভিতর হতে ভিতরে দৃষ্টিপাত করে নিজেই চমৎকৃত হন। কিন্তু নিজের ভিতর সমস্যা সৃষ্টি হয় তখনই-যখন তিনি ভিতর হতে বাইরে দৃষ্টিপাত করেন। তখনই পৃথিবীর যাবতীয় অসংলগ্নতা ও বৈরীতা তাঁর চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠে। যেমন– আমি অশেষ রূঢ়তাসহ সমভূমি ছেড়ে সমুদ্রের দিকে ছুটলাম/ তীরের ঝিনুকে পা কেটেছি, পায়ের শোণিতে লাল হয়েছে সাগর/ আশান্বিত নাবিকের চোখে বাতিঘর/ দেখে থমকে দাড়াঁই। (দরবেশের দরবারের)
তাঁর ১১ টি কবিতার প্রায় প্রত্যেকটি পাঠককে স্পর্শ না করে পারে না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য “নির্বাণে বিনীত কাঁটা, আয়না জোড়া অন্ধকার”। এ কথা সত্যি যে কবি মাহবুব মোর্শেদ এখনও মান কিংবা কাল উত্তীর্ণ বলা না গেলেও তাঁর নিরন্তর কাব্য সাধনা তাকে মহাকালের অভিযাত্রীর অভিজ্ঞান সনাক্ত করবে বলে আমরা আশাবাদী। মোর্শেদ তাঁর সতীর্থ কবিতাকর্মীদের মধ্যে এগিয়ে আছেন আমরা একথা জোর গলায় বলতে পারি।
কবি শাহেদ সা‘দ উল্লাহঃ কান্নায় রয়েছে জল, জলে ভাসে প্রেমিকার মুখ।
কবি শাহেদ সাদ উল্লাহর ১৪টি কবিতা এ আলোচনায় অন্তভূর্ক্ত। তার মধ্যে অন্যতম ‘যেতে যেতে পাতাল সড়ক’। সে নব্বই দশকের কবিতাকর্মী। কক্সবাজারের সাহিত্যানুরাগী মানুষের মনে আশা জাগানিয়া তরুণ। তাঁর কবিতার উত্তরণ সাগর তলদেশ হতে নতুন জেগে উঠা দ্বীপের মতন। পলি জমে জমে সাগর তল হতে দ্বীপখন্ড আস্তে আস্তে জলের উপর মাথা তুলে জেগে উঠে। জেগে উঠা চরে প্রথমে সবুজ বৃক্ষ লতা থাকে না। ক্রমান্বয়ে দ্বীপ-চরে সবুজের জন্ম হয়। পাখিরা আস্তে ধীরে দ্বীপে আশ্রয় নেয়। সমুদ্রের জাহাজ কখনো কখনো নোঙর রাখে দ্বীপের পার্শ্বে। মানুষ বসতি গড়ে।
শাহেদ সাদ উল্লাহর ভিতরেও সেই কবিতার দ্বীপটি তৈরী হচ্ছে বলা চলে। স্পষ্ট বলা যায় তাঁর কাব্য দ্বীপটির মানচিত্র অষ্পষ্ট ভাবে হলেও চোখে পড়ে। শাহেদ সাদ উল্লাহর ভিতরে জেগে উঠা অপার সম্ভাবনাময় কবিতার সবুজ দ্বীপ। কবিতায় তাঁর কন্ঠস্বরটি এভাবেই চিহ্নিত করি- ওখানে খুব সহজেই বেড়ে উঠেছে দক্ষিণে কিংবা/ শিমের মাচায় দু’তিনটি চুড়াই অদ্ভুত আলিঙ্গণে মত্ত/ আমার বাবা, কুমড়োর হৃদয়ে হাত বুলায়/ যেমনটা কিশোরীর হৃদয়ে প্রেমের প্রলেপ জমে প্রথম (নিমতলায় আমাদের বাড়ীতে)
নতুন জেগে উঠা দ্বীপ চরে পাখির আনাগোনা আর আশ্রয় খুজে নেবার যেমন কোলাহল পড়ে, তেমনি কবির কাব্য হৃদয়ের চরে দেখি- উড়ে যায় সীমানায় চুপি চুপি আবাবিল পাখি/ অবেলায় রোদ উঠে ঝিকিমিকি করে অনুক্ষণ/ রোদের সোনালী ঝড়ে আকাশের বুজে যায় আঁখি (কেঁপে উঠে পলাশের বন)
কবির নিজস্ব একটি কন্ঠ এখনও পরিপূর্ণ ভাবে ষ্পষ্ট নয়, একজন কবির নিজস্ব কন্ঠস্বর অর্জন অতি জরুরী। কবির অপরাপর কবিতা ‘একজন অপরাজেয় কবির পাশ্বে’, ‘মানুষ কিংবা মানুষেরা কাদে’, ‘রূপকথার গল্প’, ‘অথবা দোয়েল পাখি, ‘দুঃখ বোধ’,‘ছিপ ছিপে রোদ্দুর’, ‘শোকগাথা’, ‘নদী ও শিমুল গাছ’, ‘কিছু কিছু মানুষ’,‘বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা’,‘জোয়ান মাঝি’ ও ‘ঋণ’ কবিতাগুলো সম্পর্কে একই মন্তব্য বলা চলে। উপমা, রূপক, চিত্রকল্পের মত গুরুতর বিষয়গুলি এখনও পরিপূর্ণ মাত্রায় সবল নয়। তবে কবি তার নিরন্তর কাব্য সাধনা তাকে সিদ্ধি এনে দেবে এ বিশ্বাস আমাদের আছে।
সিরাজুল হক সিরাজঃ স্মৃতির জোয়ালে কবি এক লাঙ্গল টানে শব্দের শস্য ক্ষেতে’
কবি সিরাজুল হক সিরাজ আশির দশকের শেষ ভাগ হতে কবিতা লিখে আসছেন। তার ১১ টি কবিতা আলোচনার জন্য আমার হাতে এসেছে। এর মধ্যে ‘রূপচাঁদার কঙ্খাল’ অন্যতম। পেশায় কলেজ শিক্ষক কবি। আজীবন একটি সুর বিভিন্ন ব্যঞ্জনায় গাইতে চেয়েছেন বলে মনে হয়। কবি সিরাজ মূলত উচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে হতাশার কবিতা লিখে চলেছেন। তাঁর কবিতায় উপমা উৎপ্রেক্ষা রূপক চিত্রকল্পের অভাব না থাকলেও শব্দ ব্যবহারে আদৌ সংযমী নন।
যদিও কারো কারো মতে ‘শব্দই কবিতা, উপমাই কবিত্ব’ হয় তবে শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি সংযত নন। শুধু ‘পাজর’ কিংবা ‘রূপচাঁদা’ শব্দটি বহুব্যহারে শব্দ দুটি আমার কাছে বৈচিত্র্যহীন মনে হয়েছে। বিচ্ছেদ কিংবা বিরহের বিষয়টি কবিতার পর কবিতায় এভাবে লিখিত হওয়ায়টি অস্বাভাবিকও বটে। সব চেয়ে উপলবদ্ধি করার বিষয়টি হচ্ছে কবি যেন বুঝতে পারে পাঠক কি চান কিংবা কবিতা পাঠ করতে করতে যেন পাঠক ক্লান্তি বোধ না করেন। কোন কোন শব্দ কিংবা বাক্যের প্রতি কবির দুর্বলতা থাকতেই পারে। কিন্তু কবিকে খেয়াল রাখতেই হবে সে শব্দ কিংবা বাক্যের অতি ব্যবহার যেন চর্বিত চর্বনে পর্যবসিত না হয়। পাঠক যেন মুখ ফিরিয়ে না নেয়।
তবু আমরা কবি সিরাজুল হক সিরাজের কবিতায় পেয়ে যাই উজ্জ্বল পংক্তি যেমন–কবিরাতো পৃথিবীর অরণ্যে দ্যুতিময় অবুঝ পাথর/ কোনোদিন কোন বন কুড়াইনীই দেখবে না/কানারাজার গুহায় জ্যোৎস্নার কাফনে মোড়া জলন্ত পালক। (জলন্ত পালক)
এছাড়া তাঁর ‘ঝুমঝুমি’ কবিতাটির ভাবগাম্ভীর্য অপূর্ব। চিত্রকল্প তৈরীতে কবি সিরাজ নিপুন শিল্পীর মত শব্দের পরিবর্তে যেন রং তুলি ব্যবহার করেছেন। যেমন- উড়ে গেছে গাঙচিল, ছিড়ে গেছে পাল/ ধ্বসে গেছে আদিনাথ মরে গেছে খাল (দরিয়া দুয়ার)
কবি সিরাজের কবিতায় তাঁর পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশ পরিস্থিতি উপস্থিতি খুবই নগন্য। একমাত্রা কবিতা ‘চিঠি’ তেই তিনি লৌকিক সমাজ সংসারের কথা বলেছেন। তাও দুরস্থিত ভৌগলিক পরিবেশ নির্দেশক। অপরাপর কবিতায় শুধু নিসর্গই নায়ক। আমরা কবি সিরাজুল হক সিরাজের আরো উত্তরণ এবং মহাকালিক যাত্রায় তাঁর ভূমিকা বর্তমান ও ভবিষ্যতকে সমৃদ্ধ করবে বলেই আশাবাদী।
আসিফ নূর ঃ ‘গোটা থেকে বীজ, বীজ থেকে বৃক্ষ আদি এই প্রজনন গাথাঁ’’
কবি আসিফ নূরের একমাত্র কবিতা ‘কারবালা’ ছাড়া মোট ১০টি কবিতায় বৈচিত্র্য মাঝারি পর্যায়ের। উপমা, নিসর্গ চেতনা, চিত্রকল্প, শিল্পরূপ সম্পর্কে কবিকে আমার উদাসীন মনে হয়েছে। কবিকে সম্ভবত একথা নিঃসন্দেহে বলা যাবে, তাঁর যদি একজন পাঠকও থাকেন, কবিকে তাঁর জন্য ভাবতে হবে।
এটি শিল্প সাহিত্যের জন্য এক ধরনের দায়বদ্ধতাও বটে। কবি আসিফ নূরকে যথার্থ অর্থে পাঠকের কাছে আগে দায়বদ্ধতা সৃষ্টি করার জন্য আমি অনুরোধ জানাবো। তাঁর লিখনী শক্তিমান হিসেবে পাঠকের কাছে সামাদর লাভ করবে বলে আগামীতে আশাকরি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘বিষ কন্যা এসেছিল বেহুলার বেশে’, ‘মৃগয়া সুন্দরী’।
জাহেদ সরওয়ারঃ ‘কামনার মরুভূমিতে বালু ঝড়
তৃতীয় বিশ্বে এখন মধ্যরাত। প্রার্থনার সময়।’
কবি জাহেদ সরওয়ারের কবিতা বুদ্ধদেব বসুর ‘প্রান্তরে কিছু নেই; জানালার পর্দা টেনে দেয়’ উক্তিটি যেন স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বর্তমান সমাজ, রাজনীতি মূল্যবান মনে করেন না বলে মনে হয়। কবি নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছেন তাঁর কবিতা গুচ্ছে। কবি নিজেই ঘোষণা দেন– কেননা তুমি জন্মেছ এমন এক দেশে/ যেখানে জন্মালে কারো কোন লাভ হয় না-মৃত্যু ছাড়া। (রূপসী বাংলা)
কবি তাঁর সমাজের অক্ষমতা এবং সংস্কারকে সমান্তরাল অবস্থানে এনে মধ্যবিত্তের কামনা বাসনার স্থানে ধর্মীয় আচার ব্যবস্থারও পূর্ণবাসন ঘোষনা করেন– কামানার মরুভূমিতে বালু ঝড়/ তৃতীয় বিশ্বে এখন মধ্যরাত। প্রার্থনার সময়। মধ্যবিত্ত পরিবারের সকল দ্বন্দ্ব অভিশাপের কবলে কবি নিয়ত কোণঠাসা হচ্ছেন- একথা তাঁর আরো কবিতায় দেখা যায়– লুটেরাদের ঔরসে জন্ম নেয়া আমাদের অন্ধ ভ্রাতৃকুল/ পাঁচভাবে হাতি দেখবার পর সীমিত জগতে, অন্ধকারে/ কন্ঠস্থ গল্পে থুথুতে ছড়িয়ে দিয়েছে ভাইরাস। (যাযাবরের ঝোলা)
এই ছড়িয়ে দেয়া ভাইরাসের সামাজিক ব্যাধি মধ্যবিত্ত কবিকে মহামারীর আকারে ্আক্রান্ত না করে পারে না। কবির এই সমাজ সংলগ্নতার কারণে তাঁর কবিতা পেয়েছে মহিমা। কক্সবাজারের নব্বই দশকের তরুণ কবিতা কর্মীদের মধ্যে সম্ভবত একমাত্র কবি জাহেদ সরওয়ার সমাজ সংলগ্নতার পথ ধরে আলাদা একটি নিজস্ব জগৎ সৃষ্টি করেছেন। কবি নিজে যে জগত তৈরী করেছেন, সে জগতে তিনি নিজেও সন্দেহ জনক চরিত্র যেমন– তুমি কি অবতার কোনো, প্রেরিত পুরুষ, হাস্যকর নাস্তিক? / তিরিশ বছরের নিস্কর্মা যুবক জানো তুমি এক সন্দেহ জনক চরিত্র! (সন্দেহ জনক চরিত্র)
মুলতঃ মধ্যবিত্ত জীবনটাই সন্দেহের দোলায় দুদোল্যমান। কবি মধ্যবিত্ত সমাজের অংশভাগ মাত্র। অতএব তাঁর পরিত্রাণ সহজে নাই। কবির প্রতিটি কবিতা বার বার তাঁর পদচারণাকে প্রগাঢ় করে তুলে। আমরা কবি জাহেদ সরওয়ারের নিরন্তর কাব্য সাধনা কামনা করি। আমার বিশ্বাস সমাজ সংলগ্নতা এবং কাব্য সুষমাই তাঁকে সামনের পথ দেখাবে। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘হৃদয় তদন্ত’ (১৯৯৭)।
মোক্তার আমদ রাসেদঃ ‘অর্ধেক দিয়েছি মন অর্ধেক ঝাউবন’
কবি মোক্তার আমদ রাসেদের কবিতা গুচ্ছে একটি কবিতাও পাঠকের জন্য সহজবোধ্য কিংবা শিল্প হিসাবে পাঠকের যাতায়াতের পথ উন্মুক্ত রাখেন নি। আমার যতটুকু বিশ্বাস তিনি নিজের জন্য কবিতা গুলো লিখেছেন। হয়তো বা উদ্দেশ্য বিহীনভাবে তিনি তাঁর মনের অজান্তে লিখেছেন অথবা কবিতার মত করে লিখাগুলি বানিয়ে তুলেছেন। কবিতা বানিয়ে তোলার প্রবনতা কবি সত্তাকে ধ্বংসে করে। কবিতার ব্যাপারে আরো যত্নশীল হলে তিনি ভাল করবেন বলে আশা করি।
কক্সবাজারের কাব্য রসিকদের প্রত্যাশা নব্বই দশকের যে ক’জন কবিতাকর্মী দ্রুততর কালকে ধারন করে শিল্প সুষমার মধ্যে নিমগ্ন হয়েছেন, তাঁদের উত্তরণ তো হবেই, পরন্তু আগামীতে কাব্য কবিতার ধারা বাহিকতায় যাঁরা আসবেন তাঁরা যেন আরো শানিত এবং বুদ্ধিমান হন এ কামনা চির কালীন রইল। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘উড়ন্ত বাতাসে দূরন্ত বোধ’।







