চলতি বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল তলিয়ে গেলেও তুলনামুলকভাবে মহেশখালীতে তেমন বৃষ্টিপাত হয়নি।
তবে গেল সপ্তাহখানেক থেকে পাহাড়ি দ্বীপে ভারী বর্ষণের দেখা মিলেছে কয়েকবার। আর ভারী বর্ষণ হওয়ায় শঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে দ্বীপের পাহাড় ঘেঁষে গড়ে উঠা জনবসতির বাসিন্দাদের।
ভূতত্ত্ববিদদের ধারণা অনুযায়ী মহেশখালীর পাহাড় ঝুঁকিতে বসবাস করছে কালারমারছড়ার ৩ হাজারসহ হোয়ানক, শাপলাপুর, ছোট মহেশখালী ও বড় মহেশখালীর আনুমানিক ১০ হাজারের অধিক মানুষ।
গত কয়েকদিনে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে সে শঙ্কা আরও বহুগুণে বেড়েছে। এসব পরিবার পাহাড়ের চূড়া ও পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসতঘর গড়ে তুলেছে।
প্রতিবছর বর্ষায় এ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অনেক বসতঘর পাহাড়ের মাটি ধসে চাপা পড়ে যায়, প্রাণহানি হয় অনেকের।
গত ১৯ জুন সন্ধ্যায় কালারমারছড়া ইউপির অফিসপাড়ায় পাহাড় ধসে রবিউল হোসেন প্রকাশ রবিন (৬) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে ঐ এলাকার নজির হোসেনের পুত্র।
স্থানীয় বাসিন্দা সরওয়ার কামাল জানান, সন্ধ্যায় রবিনসহ তিন শিশু পাহাড়ের পাশে খেলছিল।
সন্ধ্যার পর রবিনকে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন পাহাড়ের অংশ ধসে পড়ার বিষয়টি নজরে আসে।
সেখানে চাপা পড়েছে কিনা সেটা দেখতে গিয়ে মাটি সরাতেই রবিনকে মাটিচাপা অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়। পরের দিন ২০ জুন বিকেল ৪টায় দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ ইয়াছিন।
এসময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন এবং পরিবারের খোঁজ খবর নেন।
কালারমারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান তারেক বিন ওসমান শরীফ জানান, বৃষ্টি শুরুর আগে থেকেই পুরো এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে। এদিকে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী শতশত পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনতে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বহুবার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু প্রবল ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের অনুরোধকে কেউ কর্ণপাত করছেনা।
ফলে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছে মহেশখালী উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
সরজমিনে দেখা যায়, কালারমারছড়া বাজারের পূর্ব পাশে পাহাড়ের উপরেই গড়ে উঠেছে নয়াপাড়া, ফকিরজুমপাড়া, অফিস পাড়া ও ফকিরাঘোনা নামক কয়েকটি গ্রাম।
এতে প্রায় ৬ শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ মাটির তৈরি ঘরে ৩ হাজার মানুষের বসবাস রয়েছে। এসব ঘর যেকোন মুহুর্তে ধসে পড়তে পারে।
এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়। তাই পাহাড় ধস থেকে রক্ষা পেতে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ে গণসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসময় তিনি স্থানীয়দের সহযোগীতা চান।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। যেখানেই পাহাড় কাটা চলছে প্রশাসনকে জানালে তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নিবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, তিনটি ভূতাত্ত্বিক কারণে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে থাকে।
পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক গঠন, বালুর বিন্যাস এবং ঢালু পাহাড়ের কারণে প্রাকৃতিকভাবে পাহাড়ধস হয়। অপরদিকে পাহাড়ে চাষাবাদ এবং বন উজাড়ের মতো ঘটনা মনুষ্যসৃষ্ট কারণগুলোর মধ্যে প্রধান।
অতিবৃষ্টিতে ফাটল দিয়ে পানি পাহাড়ের ভেতরে প্রবেশ করে।
এতে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। পাহাড়ধস বন্ধ করতে হলে পাহাড়কাটা বন্ধ, পর্যাপ্ত গাছপালা লাগানোর পাশাপাশি পানি নিষ্কাশন এবং পাহাড় থেকে বসতি উচ্ছেদ করা ছাড়া উপায় নেই।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলের ওপরের দিকের মাটিতে কঠিন শিলার উপস্থিতি নেই। ফলে এখানে পাহাড় ধসের আশঙ্কা থাকাটাই স্বাভাবিক।
তার ওপর নির্বিচারে পাহাড় কেটে বসতি গড়ে মহেশখালী অঞ্চলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হচ্ছে।







