কক্সবাজার শহরতলীর দরিয়ানগর বড়ছড়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘ঝাউবন প্রাথমিক বিদ্যা নিকেতন’ এ ১৪ বছর পরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে আগামীকাল সোমবার।
রাজারবাগী পীর সিন্ডিকেটের জবর দখলে থাকা এক একর আয়তনের জমিসহ স্কুলটি থেকে আজ রোববার সকালের মধ্যে আস্তানা সরিয়ে নেয়ার কথা রাজারবাগীদের।
প্রায় ১৪ বছর আগে রাজারবাগীদের জবর দখল করে নেয়া এলাকার স্কুল ও মসজিদ মুক্ত করার দাবিতে সম্প্রতি এলাকাবাসী আন্দোলনে নামে। ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসাবে স্মারকলিপি, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, অনশন এবং এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্যদিয়ে গত বৃহস্পতিবার এক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এলাকার মসজিদ ও স্কুল থেকে রাজারবাগীদের আস্তানা সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজার সদর থানায় অনুষ্ঠিত এক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সদর থানার ওসি শেখ মুনীরুল গিয়াস ও ওসি অপারেশনসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে মসজিদ এবং আজ রোববার সকালের মধ্যে ঝাউবন বিদ্যা নিকেতন থেকে রাজারবাগী আস্তানা সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার বিকালে এলাকার মসজিদ ছেড়ে চলে যায় রাজারবাগীরা।
এলাকার আন্দোলনকারী গ্রামবাসীদের অন্যতম সংগঠন দরিয়ানগর বড়ছড়া যুব সমাজের সাধারণ সম্পাদক ও যুবলীগ নেতা পারভেজ মোশাররফ বলেন, রাজারবাগীরা স্কুল দখল করে সেখানে মাদ্রাসার সাইনবোর্ড ঝুলানোর পর জাতীয় পতাকার স্ট্যান্ড ভেঙ্গে ফেলে এবং জাতীয় পতাকা দুমড়ে মুচড়ে ফেলে নতুন করে তাদের পীরের নামে পতাকা তুলে দেয়। এরপর থেকে গত ১৪ বছর ধরে জাতীয় পতাকার পরিবর্তে উড়ছিল তাদের পতাকা।
তিনি বলেন, সেখানে কথিত মাদ্রাসার সাইনবোর্ড ঝুলানো হলেও বাস্তবে স্থানীয় কোন শিশুকে সেখানে পড়ালেখা করানো হত না। এমনকি বেতনধারী পীর সিন্ডিকেটের সদস্যরাও তাদের সন্তানকে এই কথিত মাদ্রাসায় পড়াতেন না।
এই কথিত রাজারবাগী মাদ্রাসার পাশ^বর্তী বাসিন্দা মোস্তাক আহমদ বলেন, এখানে স্থানীয়দের পড়ালেখা না করিয়ে বাইরের এলাকা থেকে কয়েকটি শিশুকে এনে রেখা দেয়া রহস্যজনক।
তিনি জানান, এই কথিত মাদ্রাসায় পড়ালেখার জন্য কথিত চারজন শিক্ষকও এই স্কুলে বসতবাড়ি বানিয়ে বসবাস করে। ২ শতাধিক শিশুর পড়ালেখার সুবিধাসম্পন্ন এই স্কুলে ৮-১০ বছরের মাত্র ৫/৬টি শিশু, তাও বাইরের এলাকার; এখানে রেখে দেয়ার কারণ কি?
এদিকে দরিয়ানগর গ্রামবাসীর এক বৈঠকে ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলটি রাজারবাগীদের দখলমুক্ত হওয়ার পর এখানে একটি হাইস্কুল চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বর্তমানে এই গ্রামে কোন হাইস্কুল নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের অন্তত ৩ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়ালেখা করতে হয়।
শুক্রবার রাতে সাংবাদিক আহমদ গিয়াসের সভাপতিত্বে ও দরিয়ানগর যুবসমাজের সাধারণ সম্পাদক পারভেজ মোশাররফের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় আরো বক্তব্য দেন জেলা আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা কমিটির সদস্য মাওলানা আতিকুর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল খালেক, আওয়ামীলীগ নেতা শাহ আলম, বড়ছড়া যুবসমাজের সভাপতি মাহবুব আলম, সি: সহ- সভাপতি আবু ফরহাদ বোখারী হিরু, কৃষকলীগ নেতা ইমাম হোসেন, স্থানীয় বাসিন্দা আবু তাহের সওদাগর, ছলিম সওদাগর, আসমত আলী সওদাগর ও নুরুল ইসলাম প্রমূখ।
সভায় বলা হয়, ইতালীর ক্যাথলিক খৃস্টান ধর্মপ্রচারক ফাদার লুপি কক্সবাজার শহরের ডায়াবেটিক পয়েন্টে সমুদ্র সৈকতের ‘দরবার পাড়ায়’ নব্বই এর দশকের শুরুতে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু শহরের সমুদ্র তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত মানুষকে উচ্ছেদ করে দরিয়ানগরে পূনবার্সন করা হলে সেখান থেকে এই স্কুলটিও স্থানান্তর করে এখানে আনা হয় এবং নামটিও অপরিবর্তিত রাখা হয়। এখানে নির্মাণ করে দেয়া হয় টিনের ছাউনীযুক্ত পাকা ভবন। এই স্কুলটি উদ্বোধন করেন কক্সবাজারের তৎকালীন জেলা প্রশাসক এনামুল কবির। জেলা-উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারিদের ৩ বছর বেতনভাতাও দেয়া হয়েছে। বাকী সময়ে ইতালীর ফাদার লুপির পক্ষ থেকেই বেতনভাতা দেয়া হয়েছিল।
এখানে ছিল শতাধিক শিক্ষার্থীও। কিন্তু ২০০৭ সালে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে স্কুলের জমি দখল করে সেখানে মাদ্রাসার নাম ব্যবহার করে রাজারবাগী আস্তানা গড়ে তোলার পর ওই শিশুরা আর পড়ালেখার সুযোগ পায়নি। ফলে শিক্ষাজীবন থেকে তারা ঝরে পড়ে।







