ভোরের নরম আলোয় হিমশীতল পাহাড়ের চূড়ায় যখন সূর্য উদিত হয়, তা যেন লাজুক লাল টিপের মতো। আর কুয়াশায় আচ্ছন্ন মাতামুহুরী নদী ছুটে চলে সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে—তখন প্রকৃতি এক অপার্থিব আবেশে ঢেকে ফেলে মানবহৃদয়কে। সে আলোয়, সে বাতাসে, যেন এক ধ্যানমগ্ন প্রশান্তি নামে, যেখানে ঢেউয়ের মৃদু মর্মর, শৈবালের কোমল নড়াচড়া, আর পাহাড়ি নিঃস্তব্ধতার মাঝে গড়ে ওঠে নৈঃশব্দ্যের এক প্রগাঢ় সংগীত।
এই নদী কেবল এক জলধারা নয়, এটি আমাদের চেতনার ছায়াপথ। মাতামুহুরী—যার নামেই জেগে ওঠে কাব্য, যার প্রবাহে ধরা পড়ে বাংলা মায়ের স্নেহধারা। হাজার বছর ধরে মইভার শিখর থেকে নেমে আসা বরফগলা জলে পুষ্ট হয়ে মাতামুহুরী বয়ে চলেছে সময় ও ইতিহাসের বুক চিরে। তার বাঁকে বাঁকে তৈরি হয়েছে জনপদ—আলীকদম, লামা, চকরিয়া—যেখানে বাঙালি ও পাহাড়ি, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকলেই সৌহার্দ্যের পরিসরে বেঁচে থাকে।
নদীর দুই ধারে সেজে ওঠা এই ভূখণ্ড যেন জীবনের এক আলেখ্য—বাঁশঝাড়ে কুয়াশাভোর, হাটের হাঁকডাক, খেয়াঘাটের ব্যস্ততা, বালুচরের শিশুরা—সব মিলিয়ে মাতামুহুরী এক জীবনময় শিল্পকর্ম। তবে এটি কেবল মঙ্গলময় স্রোত নয়—এর মাঝে আছে ধ্বংসের ঝাঁজও। বৈশাখে যে মাতামুহুরী হাঁটুসম জলধারা হয়ে খেলে বেড়ায়, আষাঢ়ে তা রূপ নেয় প্রমত্ত ঢলে, ভাসিয়ে নিয়ে যায় ক্ষেত-খামার, হাট-বাজার। এই ধ্বংস আবার নিয়ে আসে নতুন সৃষ্টির বারতা—কাঁদা-পলির ভিতরে জন্মায় সোনালি ধান, নদীর ছন্দে ফিরে আসে জীবনের নতুন রাগিণী।
রেজাউল করিমের কবিতায় মাতামুহুরীর বুকে কলগাড়ির ছুটে চলা, মাঝিদের ভাটিয়ালি গান এই নদীকে এক জীবনধারায় রূপান্তরিত করে। এক সময় এই জলধারায় ছিল ইলিশের ঝাঁক, এখন তা কেবল স্মৃতির অতলে ডুবে থাকা স্বপ্ন—যা আমাদের মনে জাগায় হাহাকার, আবার জাগায় নদী রক্ষার প্রতিজ্ঞা।
মাতামুহুরীর তীরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ধারা যেন আকাশের প্রার্থনাগীত, যেখানে প্রতিটি বিন্দু প্রকৃতির নিঃশব্দ কণ্ঠস্বর। দূরের বাঁশবনে জলধ্বনি ও বৃষ্টির সুর মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক স্বর্গীয় আবহ। রাসূল (স.) বলেছেন, বৃষ্টি আল্লাহর রহমত—আর এই বৃষ্টিতে সিক্ত মাতামুহুরীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিশু, যুবক কিংবা জেলে, সকলেই যেন নতুন এক অনুভবের জন্ম দেয়। ছোটবেলার স্মৃতি—বৃষ্টিতে ভেজা চুল, নদীর জলে লাফানো, কিশোরী এক কল্পনার সঙ্গিনীর প্রতি হঠাৎ মুগ্ধতা—সবই এক অনির্বচনীয় আবেশে মনে বাজে।
যৌবনে এই বৃষ্টি আরও গভীরতা পায়। ‘বৃষ্টির ভেজা স্পর্শ’ গল্পে কিংবা ‘মাতামুহুরীর তীরে এক স্বপ্নিল সন্ধ্যা’তে প্রেমের অনুষঙ্গে গাঁথা এক অমর অনুভব—যেখানে প্রকৃতি হয় সহচর, প্রেম হয় রূপকথা, আর নদী হয়ে ওঠে নিঃশব্দ এক প্রেমপত্র। তরুণ হৃদয়ের নির্ভরতা, দ্বিধা, আকাঙ্ক্ষা এবং সাহস একাকার হয়ে বৃষ্টির ছন্দে মিলে যায় মাতামুহুরীর ধ্বনিতে।
কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি ছিলেন দুখু মিয়া নামে পরিচিত, তাঁর কবিতায়ও মেঘ-বরণ কেশ ও বৈরাগ্যরাঙা গিরিমাটি এই প্রাকৃতিক প্রেম ও প্রার্থনার আবহ তৈরি করে। মাতামুহুরীর রূপ—মেঘলা, বৃষ্টিময়, ঝিরিঝিরি বাতাসে ভরা—সে তো এক উন্মোচন, সে তো এক ভালোবাসার ভাষা, যাকে বুঝতে হলে হৃদয়ের দরজা খুলে দিতে হয়।
এই নদী, এই বৃষ্টি, এই পাহাড় সব মিলিয়ে মাতামুহুরী হয়ে ওঠে বাংলার নদীমাতৃক সংস্কৃতির এক জীবন্ত ব্যাখ্যা। জীবন যেমন উত্থান-পতনের, তেমনই এই নদীরও আছে শান্তি ও প্রলয়ের গল্প। গ্রীষ্মে শুষ্ক নদী যেমন আমাদের মনে হাহাকার তোলে, তেমনি বৃষ্টিস্নাত নদী আমাদের নতুন আশায় ভরিয়ে তোলে।
সবকিছু মিলিয়ে, মাতামুহুরী কেবল একটি নদী নয়—এ এক আত্মার সংলাপ, প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়ার যাত্রা। তার এই অনন্ত প্রবাহ আমাদের শিখিয়ে যায় কিভাবে ভালোবাসতে হয় একটি নদীকে, একটি ভূমিকে, জীবনের প্রতিটি ছন্দকে। মাতামুহুরী আমাদের হৃদয়ে গেঁথে দেয় শান্তি, স্মৃতি, স্বপ্ন এবং চিরন্তন প্রত্যাশার রেখা।
লেখক: সভাপতি, আলীকদম প্রেসক্লাব, বান্দরবান পার্বত্য জেলা।
তারিখ: 27 জুলাই২০২৫ খ্রি.







