পাঁচদিনের টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে মাতামুহুরী নদীর তীরবর্তী উপজেলার ১১ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় অন্তত ৮০টি গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এই অবস্থার কারণে পাঁচদিন ধরে দুর্গত জনপদের অন্তত লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
গতকাল শুক্রবার বিকালে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মাতামুহুরী নদীতে ঢলের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড চকরিয়া উপজেলার শাখা কর্মকর্তা (এসও) সহকারী প্রকৌশলী আরিফল ইসলাম। তিনি দাবি করেন, শুক্রবার রাতে নদীর উজানে লামা আলীকদমে ভারী বৃষ্টিপাত হলে ঢলের পানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বন্যার প্রার্দুভাব দেখা দেবে পুরো উপজেলায়।
এদিকে সোমবার থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত টানা পাঁচদিনের ভারী বৃষ্টিপাতে চকরিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নীচু এলাকা হাঁটু থেকে কোমড় সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। এই অবস্থায় উপজেলার সদরের সঙ্গে কয়েকটি ইউনিয়নের আভ্যন্তরিন৷ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় পড়েছে। এতে চলাচলের ক্ষেত্রে জনসাধারণ বেশ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একাধিক ইউপি চেয়ারম্যানরা।
কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ২৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
আগামী তিন দিন আরও ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবণা রয়েছে। গত পাঁচদিন ধরে চকরিয়ায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এতে মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে এসেছে পাহাড়ি ঢলের পানি। এ অবস্থার কারণে মাতামুহুরী নদীর তীরবর্তী জনপদ চকরিয়া উপজেলার সুরাজপুর মানিকপুর, কাকারা, কৈয়ারবিল, পুর্ববড় ভেওলা, বিএমচর, কোনাখালী, বরইতলী, সাহারবিল, চিরিঙ্গা, ফাসিয়াখালী, লক্ষ্যারচর ইউনিয়ন ও চকরিয়া পৌরসভার বিভিন্ন নীচু এলাকা হাঁটু থেকে কোমড় সমান পানিতে তলিয়ে গেছে।
ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি নতুন নতুন এলাকাতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তাঘাট, ফসলিজমিসহ বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো.শাহাব উদ্দিন, বরইতলি ইউপি চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান ও সুরাজপুর মানিকপুর ইউপি চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম।
বিএমচর ইউপি চেয়ারম্যান এসএম জাহাঙ্গীর আলম, কোনাখালী ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল হক সিকদার, কৈয়ারবিল ইউপি চেয়ারম্যান মক্কী ইকবাল হোসেন, ফাসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন ও পুর্ববড় ভেওলা ইউপি চেয়ারম্যান ফারহানা আফরিন মুন্না জানিয়েছেন, টানা পাঁচদিনের রেকর্ড বৃষ্টিপাত ও মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় অন্তত ৮০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে লাখেরও বেশি মানুষ গত চারদিন ধরে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
বরইতলির ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান বলেন, মাতামুহুরী নদীতে ঢলের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বরইতলী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর পঁহরচাঁদা, ডেংগাকাটা এলাকার বেশিরভাগ বসতঘরে পানি ঢুকেছে। এতে চার গ্রামের ১০-১২ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
কৈয়ারবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মক্কী ইকবাল বলেন, ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে আমার ইউনিয়নের চারটি ওয়ার্ডের নিম্নাঞ্চল এলাকায় ঢলে পানি ঢুকেছে। এতে অসংখ্য পরিবার পানির নিচে রয়েছে।
সুরাজপুর মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম বলেন, টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে আমার ইউনিয়নের পাঁচ গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, টানা ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় সরেজমিনে গিয়ে আমরা বন্যার পূর্বাভাস মোকাবিলায় পানি নিষ্কাসন সুবিধার্থে আগেভাগে উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ সুইস গেইটের জলকপাট খুলে দিয়েছি। পাশাপাশি সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং পাহাড় ধস ঠেকাতে স্থানীয় সকল ইউপি চেয়ারম্যানকে নজরদারি বাড়ানোর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো.আবু হাসনাত সরকার বলেন, নিমাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী হয়ে পড়া জনগণের জন্য কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শাহীন ইমরান ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ মেট্টিক টন চাউল বরাদ্দ দিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বারদের মাধ্যমে এসব চাউল দুর্গত মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।
চকো/জে







