চকরিয়া উপজেলা সরকারি হাসপাতাল গেইটে দীর্ঘ বছর ধরে গড়ে তোলা সরকারি অনুমোদন বিহীন একাধিক প্যাথলজি সেন্টারে মানুষের জীবন নিয়ে চলছে রমরমা বাণিজ্য। এমনকি রোগীদের স্বাস্থ্য খাতে বিপুল টাকা হাতিয়ে নিয়ে নানাবিধ পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে আসলেও এসব প্যাথলজি সেন্টারে সঠিক রোগ নির্ণয়পুর্বক রিপোর্ট দেয়ার মতো সরকারি প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত কোন টেকনোলজিস নেই। এই অবস্থার কারণে উপজেলা সরকারি হাসপাতাল গেইট ছাড়াও উপজেলার প্রভৃতি এলাকায় বিক্ষিপ্ত ভাবে গজিয়ে ওঠা এসব প্যাথলজি সেন্টারে রোগীর শারীরিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে ভুল রিপোর্ট দিয়ে রোগী সাধারনের জীবন নিয়ে চলছে রীতিমতো অপচিকিৎসা। এভাবে ভুল রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই চলছে বেশিরভাগ প্যাথলজি সেন্টারের রমরমা বাণিজ্য।
সর্বশেষ কয়েকদিন আগে এইধরনের একটি ভুল রিপোর্ট দিয়ে আলোচনায় এসেছেন চকরিয়া উপজেলা সরকারি হাসপাতাল গেইটের ল্যাব হাউস এক্স-রে এন্ড প্যাথলজি নামের একটি প্যাথলজি সেন্টার। এই প্যাথলজিতে সামান্য পেট ব্যাথার চিকিৎসা নিতে এসে ভুল রিপোর্টের শিকার হয়েছেন আট বছরের এক শিশু। পরে অপর একটি ল্যাবে পূনরায় পরীক্ষা দিয়ে কোনধরণের পেটে পাথর হয়নি বলে রিপোর্ট দিয়ে প্রাণে রক্ষা পান। এমনই অভিযোগ রোগীর আত্মীয়দের। এই ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়ছে রোগীর আত্মীয়রা।
অভিযোগ সুত্রে জানা গেছে , চকরিয়া উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের ভিলেজারপাড়ার বাসিন্দা দিনমজুর মোহাম্মদ মানিক। মানিকের আট বছরের শিশু পুত্র তামিমের গত ৬ জুলাই থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত পেটে ব্যাথার কান্না করছিলো। তার পেটের ব্যাথা বন্ধ না হওয়ায় গত ১১ জুলাই সকাল দশটার দিকে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরী বিভাগে নিয়ে আসেন। জরুরী বিভাগের চিকিৎসক তামিমকে দেখে এক্স-রে ও আলট্্রাসোনোগ্রাফি করার পরামর্শ দেন। মানিক তার পুত্র তামিমকে চকরিয়া সরকারি হাসপাতালের গেইটের সামনে ল্যাব হাউস এক্স-রে এন্ড প্যাথলজিতে নিয়ে যান।
ল্যাব হাউসের সোনোলিজিস্ট ডা. মাসুমা আক্তার চৌধুরীর তত্বাবধানে দু’টি পরীক্ষা করা হয়। আলট্্রাসোনোগ্রাফি করার পর পেটে পাথর হয়েছে মর্মে রিপোর্ট দেন ডা. মাসুমা আক্তার চৌধুরী। দ্রæত সময়ের মধ্যে পেট থেকে পাথর সরানোর পরামর্শ দেন। রিপোর্টটি পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন দিনমজুর পরিবারটি। তার মা হাউ মাউ করে কান্না করতে থাকে। কোন কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না তামিমের পিতা মানিক। উন্নত চিকিৎসার আশায় তামিমের পিতা চট্টগ্রামে চলে যান।
পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হাসপাতালের চিকিৎসক ডা.সুবাস মজুমদারের কাছে নিয়ে যান। সেখানে পূণরায় আলট্্রাসোনোগ্রাফি পরীক্ষা দেওয়া হয়। আলট্্রাসোনোগ্রাফি করার পর তামিমের পেটে পাথর হয়নি বলে রিপোর্ট দেন চিকিৎসক ডা.সুবাস মজুমদার। সামান্য ওষুধ দিয়ে বাড়িতে চলে যেতে বলেন। কোন অপারেশনের প্রয়োজন নেই বলেন তিনি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চোখে পড়ায় এই যাত্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে গেলেন ওই শিশু। বর্তমানে শিশু তামিম সুস্থ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর পরিবার সদস্যরা।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, চকরিয়া পৌরশহরের দিনের পর দিন ব্যাঙের ছাতার মতো বেড়েই চলেছে বৈধ-অবৈধ ক্লিনিক আর বেসরকারি হাসপাতাল। যার অধিকাংশ চিকিৎসা কেন্দ্রে মানহীন সেবা দিয়ে রোগীদের পকেট হচ্ছে ফাঁকা। এছাড়া পরীক্ষায় ভুল রিপোর্ট দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। চকরিয়া পৌরশহর ও সরকারি হাসপাতালের আশপাশে পৌরশহরের ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলো ছেয়ে গেছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যানার সাইনবোর্ডে। ল্যাব হাউসে পরীক্ষার নামে ভুল রিপোর্ট দিচ্ছেন। রোগীদের হয়রানী করছেন। ভূল রিপোর্টের কারণে অনেক রোগীর মৃত্যুর মতো ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে।
এদিকে ল্যাব হাউসের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ এনে রোগী তামিমের পিতা মানিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ল্যাব হাউসে রোগীদের পরীক্ষার নামে ভূল রিপোর্ট দিচ্ছেন। কোন ধরণের অভিজ্ঞ চিকিৎসক এবং সোনোলিজিস্ট নেই। টেকনেশিয়ান দিয়ে রোগীর নানা রকম পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে ল্যাব হাউসটি। তার শিশু পুত্র তামিমকে পেটে ব্যাথার জন্য পরীক্ষা করে ভূল রিপোর্ট দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমার সন্তানকে কিডনি থেকে পাথর সরানোর জন্য অপারেশন করতে বলেছিলেন। শেভরণে পূনরায় পরীক্ষা দিয়ে ভূল রিপোর্ট প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহর রহমতে প্রাণে রক্ষা পেয়েছে আমান সন্তান। ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা সিভিল সার্জনের কাছে অভিযোগ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
ল্যাব হাউসের সোনোলোজিস্ট ডা. মাসুমা আক্তার চৌধুরীর মোবাইলে একাধিবার কল দিয়েও রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ল্যাব হাউসের পরিচালক মোহাম্মদ দিদার জানান, ল্যাব হাউসে কোন ভূল রিপোর্ট দিয়েছে কী না জানি না। তবে ওই চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
চকরিয়া উপজেলা সরকারি হাসপাতালের টিএইচও ডা. শোভণ দত্ত স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, দুটি রিপোর্টে পার্থক্য আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। ল্যাব হাউসে রোগীকে ভূল রির্পোট দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চকো/জে







