কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার একসময়ের প্রমত্তা মাতামুহুরী নদীতে বেশ কয়েকবছর ধরে চলছে বিষ প্রয়োগে মাছ আহরণ পদ্ধতি। এ অবস্থার কারণে দিনদিন নদীতে মিঠাপানির মৎস্য ভান্ডার ধ্বংস হচ্ছে। এতে কমে যাচ্ছে দেশীয় মাছের বংশ বিস্তার। তাতে করে স্থানীয় জেলেরা সারাদিন জাল বসিয়েও বেশিরভাগ সময় নদীতে মাছ না পেয়ে শুন্য হাতে বাড়ি ফিরছে। এমন দৈন্যদশার কারণে জেলে পরিবারের লোকজন ইতোমধ্যে পেশা বদলাতেও শুরু করেছে
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েকবছর ধরে কতিপয় অসাধু চক্র মাতামুহুরী নদীতে মাছ আহরণে বিষ প্রয়োগের পদ্ধতি শুরু করেছেন। নদীতে বিষ ঢেলে দেওয়া হলে অধিকাংশ এলাকাজুড়ে মারা গিয়ে মাছ গুলো পানিতে ভেসে ওঠে। এতে মাছ শিকার করতে আহরণকারীদের জন্য সহজ হয়।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, নদীর তীরে তামাক চাষের কারণে এবং বিষ দিয়ে মাছ আহরণের কারণে মাতামুহুরী নদীতে মাছের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। এতে বর্তমানে নদীতে মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। একসময়ের মৎস্যভান্ডার হিসেবে প্রসিদ্ধ মাতামুহুরী নদীতে এখন মিঠাপানির মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের উপর নির্ভরশীল অন্তত পাঁচ শতাধিক জেলে মাছ সংকটে পেশা হারিয়ে বেকার হয়েছেন। ইতোমধ্যে অনেকে পেশা বদল করে অন্য পেশায় জড়িয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র জেলে সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও চকরিয়া পৌরসভার জালিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা আশরাফ আলী।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকার পর্বত থেকে উৎপত্তি হওয়া মাতামুহুরী নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮৭ কিলোমিটার। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে নদীটি বান্দরবান জেলার আলীকদম ও লামা উপজেলার ভেতর দিয়ে কক্সবাজারের চকরিয়া পেকুয়া উপজেলার বুকচিড়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে।
মাতামুহুরী নদীতে এক দশক আগেও মিঠাপানির বিভিন্ন প্রজাতির সুস্বাদু মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু আলীকদম ও লামা উপজেলায় তিন দশক ধরে পাথর উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। ফলে পাহাড়ি ঢলে নদীতে পলি জমে গভীরতা কমেছে। নদীর জেগে ওঠা চরে চলছে তামাক চাষ। এ কারণে নদীতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ আহরণ করার কারণে মাতামুহুরী নদীতে মাছের সংকট দেখা দিয়েছে।
মাতামুহুরী নদীর তীরের বাসিন্দা চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মাহমুদ বলেন, বর্ষা মৌসুমে মাতামুহুরী নদীতে পাহাড়ি পলি মাটি নেমে এসে ভরাট হয়ে যায়। পাশাপাশি নদীর চরে তামাক চাষ ও বিষ প্রয়োগের কারণে নদীতে মাছের প্রজননে ক্ষতি হচ্ছে। এ জন্য নদী পরিকল্পিতভাবে খনন করতে হবে। এতে নদীতে আবার মাছের প্রজনন বাড়তে পারে।
চকরিয়া সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম বলেন, ‘মাতামুহুরী নদীতে মাছের প্রজনন কমে যাওয়ার কারণ চিহ্নিত করতে হবে। নদীর উজানের আলীকদম ও লামা উপজেলায় পাহাড় কাটা, পাথর উত্তোলন ও গাছ নিধনই নদী ভরাটের মূল কারণ। তামাক চাষ ও বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের ফলে নদীর মৎস্যভান্ডার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নদীতে বিষ প্রয়োগ বন্ধ করলে মাছের বংশবিস্তার বৃদ্ধি পাবে।’এতে আবারও নদীতে মিঠাপানির মৎস্য ভান্ডার তৈরি হবে।
জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ফরহান তাজিম বলেন, মাতামুহুরী নদী একটি উন্মুক্ত খাল। এখানে সবাই সবকিছু করছে বিনা বাঁধায়। বলতে পারেন ‘নদীটি অরক্ষিত।
মাতামুহুরী নদী বান্দরবানের পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কক্সবাজারের চকরিয়া পেকুয়া উপজেলার বুকচিড়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে গেছে।
তিনি বলেন, বিশাল আয়তনের এই নদীতে রাতে বা ভোরে নদীতে কতিপয় চক্র বিষ প্রয়োগ করছে। অনেক চেষ্টার পরও তাদেরকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। কারণ আমাদের লোকবল কম। তবে স্থানীয়ভাবে লোকজনের অংশ গ্রহণে বিষয়টি প্রতিরোধ করা গেলে নদীতে মিঠাপানির মৎস্য ভান্ডার ধরে রাখা সম্ভব হবে।
তবে সত্যি কথা হচ্ছে, বর্তমানে নদীতে জেলেরা আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না। মাছের প্রজনন পরিবেশ আগের মতো নেই। তারপরও আমরা নদীতে বিষ প্রয়োগ কীভাবে বন্ধ করা যায়, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে পদক্ষেপ নিতে চেষ্টা করবো।







