বীর মুক্তিযোদ্ধা নজির আহমদ সাহেব আর নেই। আজ একটু আগে চট্টগ্রামে শহরের একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। তিনি ১৯৭৩ সালে অবিভক্ত কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। আজ দুপুর ২টায় সুরাজপুর পাবলিক স্কুল মাঠে তাঁর নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তাঁর সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনেক উচ্চতার। এইতো দিন পনের আগে আগে আমি তাঁকে দেখার জন্য তাঁর সুরাজপুরের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সাথে ছিলেন চকরিয়া কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক মুজিবুল হক রতন ও এডভোকেট ফয়জুল কবির। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা ভবনের বারান্দায় বসে পূবের পাহাড় দেখতে দেখতে পৃথিবীর ধূসর রূপ দেখেছি সেদিন। দেখেছি চায়ের কাপে ধূয়া উড়তে উড়তে কিভাবে জীবনের সন্ধ্যা নামে এইসব দিনে–এই পৃথিবীতে। তখনো তিনি অনেক অসুস্থ। দেখলাম, কথা বলতে গিয়ে ক্লান্তি ভর করছে। ঘন্টাখানেকের আড্ডায় ছবিও উঠিয়েছি কয়েকটি। অজানিত শংকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ছবি আর পোস্ট করা হয়নি।
তিনি কবিতা লিখতেন। কবিতার বই প্রকাশের জন্য একটি পান্ডুলিপি চকরিয়া কলেজের বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক পদ্মলোচন বড়ুয়াকে দেখার জন্য দিয়েছেন বলে জানালেন। অনুরোধ করলেন কবিতা গ্রন্থের জন্য একটি ভূমিকা যেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক জনাব মুহাম্মদ নুরুল হুদা সাহেব থেকে লিখিয়ে নিই। ওই পান্ডুলিপি ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে উপস্থিত হয়ে মহাপরিচালক মহোদয়ের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করি।
২১ ফেব্রুয়ারি নজির আহমদ সাহেব এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইলে- বললাম, ‘বাংলা একাডেমিতে একুশের বই মেলা নিয়ে বহুবিধ ব্যস্ততার কারণে হয়ে উঠছেনা। একটু অপেক্ষা করুন, হয়ে যাবে।’ এরপর ২২ ফেব্রুয়ারি মহাপরিচালক মহোদয়ের সাথে এ বিষয়ে আমার ফোনালাপ হয়েছে। আর এর মধ্যে তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি তাঁর লেখা কাব্যগ্রন্থটির মোড়ক আর দেখে যেতে পারলেননা—আপসোস।
মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁর সাথে অনেক কথা হয়েছে। যা আমার লেখা ‘স্মৃতি ও শ্রুতিতে একাত্তর’ গ্রন্থে বিবৃত হয়েছে। এছাড়া ১৯৯৫ সালে চকরিয়ার প্রথম বিজয় মেলা উপলক্ষে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত স্মারক গ্রন্থ ‘বিজয়’–এ তাঁর লেখা প্রকাশ করার সময় থেকেই তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, যা আমাকে পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করে।
১৯৭১ সালে যুদ্ধদিনে বীরমুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস মোল্লা ও নজির আহমদ সাহেবের নেতৃত্বে চুনতিতে পাকসেনাদের আটক করে পূঁটিবিলায় নিয়ে গিয়ে হত্যার ঘটনা ছাড়াও টেকনাফ থানা দখলে নেওয়ার ঘটনা তাঁর জীবনের অন্যতম কীর্তি।
তিনি শহীদ আবদুল হামিদের নেতৃত্বে গড়ে উঠা মুক্তিযোদ্ধের একটি গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন। শহীদ আবদুল হামিদ হানাদার বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর নজির আহমদ সাহেব ওই বাহিনীর কমান্ডের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন অভিযানে নেতৃত্ব দেন। একের পর এক সফল অভিযান করে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় তথা মাতৃভূমিকে দখলদার মুক্ত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি চকরিয়া থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ছিলেন।
শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক বীর মুক্তিযোদ্ধা নজির আহমদ সাহেব আপাদমস্তক একজন সজ্জন মানুষ। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি স্ট্রোক জনিত শারীরিক সমস্যায় ছিলেন। তাঁর মহাপ্রয়াণ আমাদের জন্য ব্যথার, কষ্টের। তাঁর অনুপস্থিতির অভাব সহসা ঘুচবেনা।







