শুরু হয়েছে ১৫ তম ব্রিক্স সম্মেলন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা নিয়ে গঠিত ব্রিক্স দেশগুলোর এই ঐতিহাসিক ১৫তম শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। ব্রিকস হল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মত বিশ্বের পাঁচটি নেতৃস্থানীয় উদীয়মান বাজার অর্থনীতির শক্তিশালী দেশ নিয়ে গঠিত একটি জোট। যা ২০০৬ সালের জুনে গঠিত হয়।
প্রথমে চারটি দেশ নিয়ে (দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়া), ব্রিক্স গঠিত হয়। পরে দক্ষিণ আফ্রিকা (২০১০ সালে) ব্রিক এ যুক্ত হওয়ায় এর নতুন নাম ব্রিক্স হয়। ব্রিক্স এর সদর দপ্তর চীনের সাংহাই প্রদেশে। মনে করা হচ্ছে, এই অর্থনৈতিক জোটটি ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করবে। কারণ ব্রিকস দেশগুলোর জনগণ সমগ্র বিশ্বের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও বেশি।
আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সহযোগিতার প্রচার করা ছাড়ও বৈশ্বিক মানবতা বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা এবং ন্যায়সঙ্গত ও ন্যায্য বিশ্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করাই ব্রিক্স এর লক্ষ্য। এর পাশাপাশি ২০১৪ সালে ব্রিকস রাষ্ট্রসমূহ কর্তৃক নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এনডিবি একটি উন্নয়ন ব্যাংক। এনডিবি-র চুক্তি অনুসারে, এই ব্যাংকটি ঋণ প্রদান, গ্যারান্টি, সমতা, অংশগ্রহণ এবং অন্যান্য আর্থিক উপকরণের মাধ্যমে সরকারি বা বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্প সমর্থন ও অনুদান প্রদান করতে পারবে। ফলে ব্রিক্স গঠনের উদ্যোগ এবং এর কার্যক্রম নিয়ে বিশ্বব্যাপী বেশ আগ্রহ তৈরী হয়।
কোভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাব এবং পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী বিধিনিষেধের পর এটিই হবে সরকার প্রধানদের সশরীরে অংশগ্রহনের মাধ্যমে প্রথম ব্রিক্স শীর্ষ সম্মেলন। তদুপরি ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি এখন বহুমুখী সংকটের কবলে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করতে থাকায় সম্মেলনটি বেশ আগ্রহের সঞ্চার করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বিশ্ব এখন অস্থির সময় পার করছে। সহসা এই ইউক্রেন যুদ্ধ থামবে এমনটি মনে করার কোনো উপায় নেই। কারণ পশ্চিমা পরাশক্তি প্রকাশ্যে ইউক্রেনকে সামরিক সহযোগিতা দিচ্ছে। এমন বৈশ্বিক পরিস্থিতে ব্রিক্স এর এই সম্মেলন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রধানত এই কারণে যে, ব্রিক্স এর সদস্য ৫টি দেশের অন্যতম দেশ হচ্ছে রাশিয়া, যে ইউক্রেনে যুদ্ধের মাঠে পশ্চিমা পরাশক্তিকে মোকাবেলা করছে। যে কিনা ন্যাটো জোটের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল নেতৃত্ব দিয়েছে এবং যে এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে চোখ রাঙিয়ে পাল্লা দেয়ার মতো পারমাণবিক শক্তিধর একটি দেশ।
সে যাই হোক, ‘পার্টনারশিপ ফর মিউচ্যুয়ালি এক্সিলারেটেড গ্রুথ, সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইনক্লুসিভ মাল্টিলেটারেলিজম’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এই বছরের তথা ১৫ তম শীর্ষ সম্মেলন হচ্ছে।
এ পর্যন্ত প্রায় ২২টি দেশ ব্রিক্সের সদস্য হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে এবং পাঁচটি মূল সদস্য নতুন সদস্য নিতে তাদের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তবে কবে নাগাদ নতুন সদস্যরা বিক্স-এ যোগদান করবেন সে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে পাঁচটি সদস্য দেশের ঐকমত্যের উপর। তবে এবারের ব্রিকস সম্মেলনে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন। এই নতুন সদস্যদের কীভাবে বাছাই করা হয় এবং কোন কোন দেশ যোগ্য বলে বিবেচিত হবে তার দিকে সবার দৃষ্টি। যতদূর জানা গেছে, ব্রিকস নেতারা কিছু উদীয়মান অর্থনীতির দেশকে অন্তুর্ভুক্তির কথা ভাবছেন। আর এদেশ গুলো হলো– সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশসহ প্রায় আটটি নতুন দেশ।
বৈঠক থেকে কী ধরনের ফলাফল আসবে সেই উচ্চ আশা নিয়ে অপেক্ষা করছেন সংশ্লিষ্টরা৷ চায়না ডেইলিতে ৭ আগস্ট প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, অন্যান্য অনেক দেশ তাদের নিজস্ব অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার উপায় হিসাবে ব্রিকসের দিকে তাকিয়ে আছে। ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাস এটি শেয়ার করেছে।
প্রবন্ধটিতে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফিলানি এমথেম্বুর উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ সবক্ষেত্রে প্রভাব ফেললেও সদস্য দেশগুলো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে উন্নতি করছে।
বহুপক্ষীয় দিক সম্পর্কে মেথিবু বলেন, ‘এটি স্বীকৃতি যে, গত কয়েক বছরে সংকটে পড়েছে বহুপাক্ষিকতা। এটি যে উদ্দেশে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তা অর্জন করতে পারেনি। এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপাক্ষিকতাকে শক্তিশালী করা। এটা গুরুত্বপূর্ণ যে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রতিপাদ্যের মধ্যে আফ্রিকান গুরুত্ব তুলে ধরেছে।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও চীন-আফ্রিকা উন্নয়ন সহযোগিতা বিষয়ক কেনিয়ার গবেষক ক্যাভিন্স অ্যাডহেয়ার বলেছেন, আফ্রিকান দেশগুলো আশা করে যে ব্রিকস তাদের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের আরও সুযোগ দেবে।
তিনি বলেন, ব্রিকস দেশগুলোর জনগণ সমগ্র বিশ্বের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও বেশি। এই বৃহৎ বাজারগুলোতে প্রবেশাধিকার আফ্রিকার অনেক উদীয়মান অর্থনীতির দেশকে দ্রুত বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা করতে পারে।
দ্য চায়না ডেইলির নিবন্ধে অ্যাডহেয়ারকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ করা বিশ্বে আফ্রিকান দেশগুলোর জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সক্রিয় উপায় তৈরি করতে পারে ব্রিকস। যেগুলোতে পশ্চিমা শক্তিগুলোর আধিপত্য রয়েছে।’
জানা গেছে হচ্ছে, ৪০টিরও বেশি দেশ এই শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে আগ্রহী। এতে বুঝা যায়, গ্রুপটি কতটা জনপ্রিয় হওয়ার পথে রয়েছে। বেশিরভাগ দেশ মনে করে ব্রিকসে যোগ দিলে তারা তাদের উন্নয়নের সমস্যা সমাধান করতে পারে। এই সম্মেলন সফল হলে বিশ্বব্যাপী পশ্চিমাদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক আধিপত্য খর্ব হওয়ার পথে জোটটি আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। যা দেখার জন্য বিশ্ব নজর রাখছে দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে।







