বাঙালি জাতির আদর্শরূপে যে সকল ব্যক্তি নিজেদের ত্যাগ তিতিক্ষার মাধ্যমে অমর, স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির এই নেতার বলিষ্ঠ ও সুদৃঢ় নেতৃত্বের কারণেই বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। তিনি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এই চারটি বিষয়কে মূল স্তম্ভ করে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। তার জীবন ও দর্শন গড়ে উঠেছে খাঁটি বাঙালিত্বের মূল্যবোধকে ভিত্তি করে। তিনি ছিলেন বাংলার পলি মাটি থেকে উঠে আসা অবিসংবাদিত ক্ষণজন্মা এক মহাননেতা।
ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেও বিশেষ করে ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে তিনি নিজের রাজনৈতিক চিন্তার বহিপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। বাংলার দুঃখি মানুষের মুখে হাসি ফুটানো এবং সোনার বাংলা গড়াই ছিল- তার জীবনের একমাত্র স্বপ্ন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ৬ দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭০’র সাধারণ নির্বাচন ও ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।
তিনি ফাঁসির দড়িকেও ভয় করেননি। তিনি বাংলা ও বাঙালিকে কি গভীরভাবে ভালোবাসতেন, যা তার সংগ্রামী জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দেখা যায়। সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষণ তিনি মত্যুর সাথে লড়াই করে পাড়ি দিয়েছেন। মানুষকে প্রগাঢ়রূপে ভালো না বাসলে, কেবল রাজনীতি কিংবা ক্ষমতার জন্য, কখনো কেউ জীবন বিপন্ন করে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ব্যাপৃত হতে পারেনা। বাংলার সাধারণ মানুষের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এর অধিকার আদায়ে ছিলেন তিনি নির্ভিক।
বাঙালি জাতিসত্ত্বার বিকাশ, জাতীয়তা, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িকতা তথা সর্বস্তরের নাগরিকের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ ও চিন্তাধারার মূল কেন্দ্রবিন্দু। যার বহিপ্রকাশ ঘটে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশের সংবিধানে মূলনীতি হিসেবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্তর্ভুক্তকরণ। সংবিধানে এই চার মূলনীতি গ্রহণের মধ্যদিয়ে মূলত বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনের পরিস্ফূটন ঘটেছে। তাঁর এই দর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তা বাঙালিত্ব থেকে বিকশিত হয়েছে, ধার করা কোনো কিছু নয়। তাঁর এই আদর্শ, নীতি ও দর্শন তাঁকে দিয়েছে অমরত্বের গৌরব, নিয়ে গেছে ইতিহাসের এক অনন্য উচ্চতায়।
তাইতো স্বাধীনতার পরে একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে মাত্র সাড়ে তিন বছরে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করানো সম্ভব হয়েছে। কৃষি উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, শিশু আইন, পরিকল্পনা কমিশন, প্রথম পঞ্চম বার্ষিকী পরিকল্পনা, কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ আইন পাস ছিল তাঁর দূরদর্শী প্রজ্ঞা।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাত্রিতে যেভাবে নৃশংস হত্যাকান্ড সংঘটিত করে বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছিল, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন মর্মস্পর্শী, অমানবিক ও বেদনাদায়ক ঘটনা দ্বিতীয়টি আর নেই। বঙ্গবন্ধু আজ নেই, কিন্তু তাঁর দর্শন আছে বাঙালির চেতনায়, তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা আছে বাঙালির মগজে। তাঁর প্রদর্শিত পথ ধরে বাংলার অবিসংবাদিত নেত্রী বঙ্গবন্ধু তনয়া, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। তাই এই শোকাবহ আগস্ট মাসে বলতে চাই, বাঙালিকে মর্যাদাবান একটি জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও দর্শন ছড়িয়ে দিতে হবে।







