বাঙালির মুখে হাসি ফোটানো ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের দর্শন। বঙ্গবন্ধুর সমগ্র চিন্তা-চেতনা জুড়ে ছিল বাঙালি আর বাংলাদেশ। বাংলার শোষিত, নিপীড়িত ও হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই ছিল তাঁর রাজনীতির মূখ্য বিষয় । বাংলার গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যেকোন ত্যাগ স্বীকারে তিনি প্রস্তুত ছিলেন। এই লক্ষ্যে তিনি ছিলেন আপোষহীন। ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতেও তিনি কখনো দ্বিধা করেননি।
কিভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা যায়, কিভাবে বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত করা যায়— সেই লক্ষ্যে তিনি কাজ করে গেছেন।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময়ও তিনি তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মূখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে বাংলাকে অখণ্ড রাখার প্রয়াসের সাথে যুক্ত ছিলেন।
ওই সময়ে তিনি তাঁর অবস্থান পরিস্কার করেছেন তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ভাগ হতে দেবনা, এর জন্য সভা করতে শুরু করলাম।… শহীদ সাহেব ও হাশিম সাহেব মুসলিম লীগের তরফ থেকে এবং শরৎ বসু ও কিরণশংকর রায় কংগ্রেসের তরফ থেকে এক আলোচনা সভা করেন। তাঁদের আলোচনায় এই সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাদেশ ভাগ না করে অন্য কোন পন্থা অবলম্বন করা যায় কিনা? … বাংলাদেশের কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতারা একটা ফর্মুলা ঠিক করেন। বেঙ্গল মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি এক ফর্মুলা সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে।… তাতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে। জনসাধারণের ভোটে একটা গণপরিষদ হবে। সেই গণ পরিষদ ঠিক করবে বাংলাদেশ হিন্দুস্তান না পাকিস্তানে যোগদান করবে, নাকি স্বাধীন থাকবে।… এই ফর্মুলা নিয়ে জনাব সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসু দিল্লীতে জিন্নাহ ও গান্ধীর সাথে দেখা করতে যান। শরৎবসু নিজে লিখে গেছেন যে জিন্নাহ তাঁকে বলেছিলেন, মুসলিম লীগের কোন আপত্তি নাই, যদি কংগ্রেস রাজি হয়।… শরৎ বসু কংগ্রেসের নেতাদের সাথে দেখা করতে যেয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছিলেন। কারণ, সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল তাঁকে বলেছিলেন, “শরৎ বাবু পাগলামী ছাড়েন, কলকাতা আমাদের চাই।” মাহাত্মা গান্ধী ও পণ্ডিত নেহেরু কোন কিছুই না বলে শরৎ বাবুকে সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেলের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আর মিস্টার প্যাটেল শরৎ বাবুকে খুব কঠিন কথা বলে বিদায় দিয়েছিলেন। কলকাতা ফিরে এসে শরৎ বাবু খবরের কাগজে বিবৃতির মাধ্যমে একথা বলেছিলেন এবং জিন্নাহ যে রাজি হয়েছিলেন একথা স্বীকার করেছিলেন (অসমাপ্ত আত্মজীবনী পৃ: ৭৩,৭৪)।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী চেয়েছিলেন, লাহোর প্রস্তাব অনুসারে স্বাধীন বৃহত্তর বাংলা। তিনি চেয়েছিলেন, অবিভক্ত বাংলা ও আসাম নিয়ে একত্রিত বা বৃহত্তর বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু ১৯৪৬ সালের ৭,৮ ও ৯ এপ্রিল জিন্নাহ সাহেব দিল্লীতে ভারতবর্ষের মুসলিম লীগপন্থী কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের কনভেনশন আহ্বান করেন। এই কনভেনশনে লাহোর প্রস্তাবে ইংরেজি ভাষায় লিখিত States শব্দটিকে ছাপার ভুল বলে দাবী করে ‘S’ অক্ষরটি বাদ দেয়া হয়। ফলে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে একাধিক রাষ্ট্রের পরিবর্তে একটি মুসলিম রাষ্ট্র বা States প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। এতে করে অবিভক্ত বাংলা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পথ সুদূর পরাহত হয়।
এছড়া জিন্নাহ সাহেবও শেষ পর্যন্ত বাংলাকে অখণ্ড রাখার ব্যাপারে জোরালো কোনো অবস্থান নেননি। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলার ভবিষ্যৎ বিষয়ে সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপকে অবিভক্ত বাংলা আন্দোলনে মৌখিকভাবে সমর্থন দেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের একটি গ্রুপ বাংলা মুসলিম লীগের মওলানা আকরাম খাঁ-নাজিমউদ্দিন গ্রুপকে স্বাধীনবাংলা পরিকল্পনা বানচালের প্ররোচনা দিতে থাকে।
বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘কেন্দ্রীয় লীগের কিছু কিছু লোক কলকাতা ভারতে চলে যাক এটা চেয়েছিল বলে আমার মনে হয়। অথবা পূর্বেই গোপনে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। সোহরাওয়ার্দী নেতা হলে তাদের অসুবিধা হত তাই তারা পিছনের দরজা দিয়ে কাজ হাসিল করতে চাইল। কলকাতা পাকিস্তানে থাকলে পকিস্তানের রাজধানী কলকাতায় করতে বাধ্য হত, কারণ পূর্ব বাংলার লোকেরা দাবি করত পাকিস্তানের জনসংখ্যায়ও তারা বেশি আর শহর হিসেবে তদানিন্তন ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ শহর কলকাতা (অসমাপ্ত আত্মজীবনী পৃষ্ঠা: ৭৮-৭৯)।
এ ব্যাপারে হারুন-অর-রশিদ লিখেছেন, লাহোর প্রস্তাবে ব্যক্ত বহুমাত্রিক রাষ্ট্রধারণার আলোকে দেশ বিভাগের প্রাক্কালে আবুল হাশিম ও কিরণ শংকর রায়কে সঙ্গে নিয়ে যুক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ভারত ও (পশ্চিম) পাকিস্তানের বাইরে তৃতীয় ‘অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করলে বঙ্গবন্ধু এর সমর্থনে এবং বাংলা ভাগের বিরোধীতা করে কলকাতায় সভা সমাবেশ করেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ভারতের সাথে বাংলাও বিভক্ত হয়ে যায়।
বাংলাকে অখণ্ড রাখার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেলে বঙ্গবন্ধু কলিকাতা থেকে পূর্ব বাংলায় ফিরে এলেও পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের অধীনে রাখার ব্যবস্থা তিনি মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেননি।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এর কায়েমী স্বার্থবাদী শাসকগোষ্ঠীর তরফে সহসা পূর্ব বাংলার উপর জুলুম, নির্যাতন শুরু হয়। ফলে স্বাধীন দেশে বসবাসের যে সুখ স্বপ্ন পাকিস্তান আন্দোলনের বাঙালি কর্মীরা দেখেছিল, তাদের সে স্বপ্ন সহসা ভেঙ্গে যায়।
বঙ্গবন্ধু দেখলেন যে, বাঙালির জন্য নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ব্যতিরেকে বাঙালির মুক্তি নেই। তাই তিনি বাঙলার মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির লড়াই শুরু করেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক মুক্তি অর্জিত হয়। এরপর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ শুরু করেন, শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত দেশ গঠনে তিনি মনোনিবেশ করেন।
স্বাধীনতার পর দেশের সামগ্রিক পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু আত্মনিয়োগ করেন। সমবায়ের মাধ্যমে উন্নয়ন, কৃষি-খাদ্যের উন্নয়ন, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ, পরিকল্পনা কমিশন গঠন, কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন ইত্যাদি উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তিনি তৈরি করেন।
অল্প সময়ের (১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর) মধ্যে তিনি বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়ন করেন, যা বিশ্বের অনন্য একটি সংবিধান। সংবিধানের চারটি মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা আমাদের স্বাধীনতারই প্রতিফলন।
নারী, শিশু অথবা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কোনো আইন করার প্রয়োজন থাকলে তার ব্যবস্থা সংবিধানে বঙ্গবন্ধু সন্নিবেশ করে গেছেন। তিনি সংসদে নারী সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করে গেছেন। সেই সময়ে এই ধরনের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অতুলনীয় ও অনন্য। এই মহান নেতা নিজের জীবন বাঙালির জন্য উৎসর্গ করে গেছেন।
বঙ্গবন্ধু তাঁর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে প্রায় ৪৬২র অধিক আইন প্রণয়ন করে গেছেন। শিশু আইন ১৯৭৪, সমুদ্রসীমা নির্ধারণের দিক নির্দেশনা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশকে তিনি সদস্য করেছেন। তাঁর সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে ১০০টির বেশি দেশের স্বীকৃতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
এভাবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত ভীতের ওপর দাঁড়িয়ে আজ তাঁরই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার পথে প্রিয় স্বদেশ এগিয়ে যাবে- জাতির পিতার ৪৮তম শাহাদাত বার্ষিকীতে এই হোক সকলের প্রত্যয়।







