গত শনিবারের কথা- ধানক্ষেতে কাজ করতে গিয়েছিলেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার ধোপাকুরা গ্রামের কয়েকজন কৃষক। কাজ করতে করতে তাদের নজরে আসে ক্ষেতের মধ্য থেকে বেরিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছে অদ্ভুত একটি প্রাণী, যা এর আগে তারা কখনও দেখেননি। শুরু হয়ে যায় শোরগোল। কৃষকরা ধাওয়া করে ধরে ফেলেন প্রাণীটিকে। বেঁধে রাখেন ক্ষেতের কাছাকাছি গ্রামের একটি বাড়িতে।
অদ্ভুত এই প্রাণী দেখতে ভিড় জমাতে থাকে লোকজন। এ কান-ও কান হতে হতে সে খবর পৌঁছে যায় স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনের সদস্য এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে। তারাও ছুটে আসেন প্রাণীটিকে দেখতে।
স্থানীয় পরিবেশবাদী রবিউল ইসলাম মণ্ডল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘খবর পেয়ে গিয়ে দেখি প্রাণীটিকে একটি বাড়িতে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। সেটি কোথা থেকে এবং কীভাবে ধানক্ষেতে এসেছে, তা কেউ বলতে পারেননি। তারা এর আগে এ ধরনের কোনো প্রাণীও দেখেননি।
তবে শেরপুর বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা সুমন সরকার বলেছেন, প্রাণীটির নাম ‘হগ বেজার’। অনেকে এটিকে গোরখোদকও বলে থাকেন। কেউ কেউ আবার বলেন বালিখোদক শূকর। নিশাচর স্তন্যপায়ী এ প্রাণীর দেখা পাওয়া বেশ কঠিন।
পরে ওই দিন সন্ধ্যার দিকেই বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীটিকে স্থানীয় গারো পাহাড়ের বনভূমিতে অবমুক্ত করা হয় বলে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন ময়মনসিংহ বন বিভাগের মধুটিলা রেঞ্জ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, খাদ্যের সন্ধানে হগ বেজারসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী মাঝেমধ্যেই লোকালয়ে চলে আসে। গ্রামের মানুষ এই বন্য প্রাণীকে আটক করে আমাদের খবর দেন। আমরা গিয়ে প্রাণীটিকে নিয়ে গত শনিবার সন্ধ্যার দিকে বনে অবমুক্ত করি।
বন বিভাগের কর্মকর্তা সুমন সরকার জানান, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচারের (আইইউসিএন) লাল তালিকায় এটির নাম রয়েছে। অর্থাৎ এটি সংকটাপন্ন বিরল প্রজাতির বন্য প্রাণী।
এটিকে এলাকাবাসীর উপস্থিতিতে মধুটিলা ইকোপার্ক এলাকার গহীন বনে অবমুক্ত করা হয়েছে। তিনি জানান, এ ধরনের বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণী সংরক্ষণে বন বিভাগের কঠোর নজরদারি রয়েছে।
স্তন্যপায়ী বিশেষজ্ঞ আসিফুজ্জামান পৃথিল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ইংরেজিতে এদের hog-badgar বলা হয়ে থাকে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Arctonyx collaris। বাংলায় বহুল প্রচলিত নাম গোরখোদক।
এটা দেখতে অনেকটা বন্য শূকরের মতো। তবে এর মুখ বন্য শূকরের চেয়ে খানিকটা সরু এবং পেছনের দিকটা অনেক বেশি স্থূলাকৃতির। এ দুই প্রাণীর পার্থক্য হলো- বন্য শূকর মাটি খুঁড়ে অনেক বেশি জায়গা নেয় কিন্তু গভীরতা কম হয়।
অন্যদিকে গোরখোদক মাটি খোঁড়ে অনেক গভীরভাবে। এরা সাধারণত পচা জীবজন্তুর মাংস খেয়ে থাকে। এমনকি কবর খুঁড়ে মানুষের মরদেহও খেয়ে থাকে। এ কারণে এদের গোরখোদক বলা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে এটি প্রথম বিশেষজ্ঞদের নজরে আসে ২০১২ সালে। এটি বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২-এর তফসিল ১ (এক) ভুক্ত। এখন পর্যন্ত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ৬-৭টি হগ বেজারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। প্রাণীটি গারো পাহাড়ে আরও থাকতে পারে।







