প্রথম আলোর ৫ জুলাই তারিখের ‘অধুনা’ পাতায় তানজিনা হোসেনের একটি লেখা ‘বাংলা মাধ্যম, নাকি ইংরেজি’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেশের ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি বিষয়ে বর্তমান সময়ের অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার একটি বাস্তব চিত্র লেখিকা তুলে ধরেছেন।
লেখাটি পড়ে এ দেশের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার বিষয়ে আরো কিছু ভাবনা মাথায় এলো বলে এখানে তা তুলে ধরা হলো। লেখিকা বাংলা কিংবা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানোর পক্ষে-বিপক্ষে অভিভাবকদের যে সকল ইতিবাচক বা নেতিবাচক ভাবনা রয়েছে, তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তাঁর লেখায় পড়াশোনার শেষে ছেলেমেয়েদের দেশ-বিদেশের চাকুরি সংস্থানের বাজারভিত্তিক একটা ভাবনা ফুটে উঠেছে বেশি।
একটি শিশুর পড়াশোনা মানে শিশুর দেহমন গড়ে তোলার সাথে-সাথে বিষয় জ্ঞান অর্জন করা বুঝে থাকি। শিশুর শরীর-মন গড়ে তোলার জন্য বিদ্যালয়ের শ্রেণী কক্ষে ও বিদ্যালয়ের মাঠে কি কি শারীরিক সক্রিয়তা সৃষ্টির কার্যক্রম আয়োজন করতে পেরেছে এবং মনের স্ফূরণ ঘটাতে কি কি আনন্দধারার সঙ্গীত-নৃত্য-চিত্রকলা বিষয়ভিত্তিক কার্যক্রম রেখেছে- সবকিছু তার উপর নির্ভর করে।
বিদ্যালয়ে তার অস্তিত্ব রয়েছে কি নেই, পর্যবেক্ষক মাত্রই তা জানেন। আমার ধারনা অনেক বিদ্যালয়ে তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিষয় জ্ঞান অর্জন ও তার বিকাশের জন্য মাতৃভাষার মাধ্যমে যে তা উত্তমভাবে অর্জন করা যায়, সে কথা অবিসংবাদিতভাবে সত্য বলে জানা গেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উক্তি ‘শিক্ষায় মাতৃভাষা মাতৃ দুগ্ধস্বরূপ’ আমরা সকলে জানি। আমরা সকলে তাঁকে মান্য করি কিন্তু তাঁর পরামর্শ শুনতে নারাজ। শিক্ষায় মাতৃভাষার অভাবে শিক্ষা পরিপুষ্টি লাভ করে না, সর্বাঙ্গীন হয় না। রাশিয়া, জাপানের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো ভ্রমন করে রবীন্দ্রনাথের এই বদ্ধমূল ধারনা আরও জোরালো হয়।
চীন, রাশিয়া, জাপান, জার্মানী, ফ্রান্স, সুইডেন নরওয়ে, ফিনল্যান্ডসহ আরো অনেক শিল্পোন্নত দেশ মাতৃভাষাকে অবলম্বন করে শুধু শিক্ষাকে নয়, প্রকৃতিকেও জয় করেছে, বিজ্ঞানকে নিজের আয়ত্বে এনেছে, শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছে এবং দারিদ্র্য দূর করে জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটিয়েছে। ওই সব দেশে তাদের শিশুদের জন্য মাতৃভাষা শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা বা অন্যান্য বিদেশী ভাষা শিক্ষার সুযোগও তৈরি করে রেখেছে এবং প্রয়োজন মাফিক ইংরেজি শিক্ষা দিচ্ছে।
কোনো উন্নত দেশ কিংবা যারা অনুন্নত দেশ থেকে উন্নতি লাভ করেছে, শিশুর শিক্ষা মাতৃভাষায় দেবার সুযোগ তৈরির এবং তা দেবার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টির লাগাম টেনে না ধরে শুধুমাত্র শিক্ষা-ব্যবসায়ীর উপর বিষয়টা ছেড়ে দেবার নজির বাংলাদেশ রাষ্ট্র ছাড়া কোথায় দেখতে পাওয়া যাবে?
মাতৃভাষায় শিশুর শিক্ষা গ্রহণের সর্বোত্তম পন্থা স্বীকার করে নেওয়া ছাড়াও বাংলাদেশ রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করে আসছেন, দীর্ঘদিন ধরে এ দেশের নীতি-নির্ধারণে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন, তাদের উপর অন্য রাষ্ট্রের চেয়ে আরেকটি অতিরিক্ত দায় মাথার উপর ছেপে আছে। তা হলো- এ অঞ্চলের বাঙালি জনগণের মাতৃভাষার দাবির স্বীকৃতি অর্জনের লড়াই-সংগ্রামের ঐতিহাসিক দায়।
মাতৃভাষাকে সমাজের ও রাষ্ট্রের সকল কাজে সর্বব্যাপ্ত হয়ে প্রতিষ্ঠা করার প্রত্যয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবি তুলে রক্ত দেবার দায়। এ দায় নিহিত রয়েছে এ রাষ্ট্র সৃষ্টির ইতিহাসের মর্মমূলে।
বলা বাহুল্য, এ বাংলাভাষা পৃথিবীর একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর বিকশিত ভাষাও বটে। অতএব, বাংলাভাষা-ভাষী এ জাতি-রাষ্ট্র তার জনগণের জন্য শিক্ষার মূলধারা হিসাবে বাংলাভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে দ্বিধান্বিত হবে- তা ভাবা যায় না। এবং এ কাজটি ব্যবসায়ী শ্রেণীর উপর ছেড়ে দিয়ে রাষ্ট্র রক্ত দিয়ে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করা বাংলা ভাষাকে অপাংক্তেয় চোখে দেখবে, এর চেয়ে কলংক বাংলাদেশ রাষ্ট্র-গড়ার ইতিহাসে আর কি হতে পারে?
লেখিকা লেখার উপসংহার টানতে গিয়ে উক্ত লেখায় লিখেছেন, ‘সব কথার শেষ কথা হলো, যে মাধ্যমেই সন্তান পড়ুক না কেন, সে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠছে কিনা, তার মেধা ও প্রতিভার সঠিক বিকাশ হচ্ছে কিনা, তার নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলির স্ফূরণ কীভাবে হচ্ছে, সে একজন ভালো মানুষ, সে একজন ভালো ও সংবেদনশীল মানুষ হয়ে উঠছে কিনা- এগুলোই আসল লক্ষণীয় বিষয়।’ তিনি যে-আশা পোষণ করছেন, মাতাভাষাকে বিসর্জন দিয়ে আরবি, ইংরেজি যে মাধ্যমেই পড়ুক না কেন পড়ুয়ার কাছ থেকে এতো কিছু গুণাবলি অর্জন সম্ভব হবে। এটি দূরাশা মাত্র।
শিশু নিজের দেশের ভাষা- মাতুভাষা- বাংলা না শেখে, বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য নিজ মাতৃভাষায় না পড়ে এবং এভাবে নিজের দেশকে না জেনে, কি করে একজন শিশুর ‘প্রতিভার সঠিক বিকাশ’ ও ‘সংবেদনশীল মানুষ’ হয়ে উঠা আশা করছেন, তা ভেবে পাই না। মাতৃভাষা শেখা থেকে বঞ্চিত এ-ধরনের শিশুর কাছ থেকে তিনি নৈতিক ও চারিত্রিক গুণবলির স্ফূরণও আশা করছেন।
এ ধরনের শিশুর মাতাপিতা বা শিক্ষক শিশুদেরকে মাতৃভাষা শেখা বা মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করাটাই তো প্রথম বড় ধরনের অনৈতিক কাজ। চারিত্রিক গুণাবলি শিশু যেমন প্রথম থেকে তার মায়ের কাছ থেকে শেখে, তেমনি সবকিছু শিশু মাতৃভাষায় শিখতে পারলে তার নৈতিক-শক্তি ও চারিত্রিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায়।







