কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে
অগ্নিকান্ডের ঘটনায় গৃহ হারিয়েছে ২০ হাজার রোহিঙ্গা। ঘরবাড়ি পুড়েছে ৩ হাজারের অধিক এবং দুটি মার্কেটের দোকানপাট পুড়েছে প্রায় শতাধিক। এতে আহত হয়েছেন অর্ধশত।
জানা গেছে, আরসা – আল ইয়াকিন ও কতিপয় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী একাকার হয়ে বসতবাড়ি ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে। লুটপাট করা হয়েছে স্থানীয়দের বেশ কয়েকটি বসতবাড়িও। এঘটনায় এই পর্যন্ত একজনকে আটক করা হয়েছে। তবে আটককৃতের নাম পরিচয় জানা যায়নি। ঘটনাটি নাশকতামূলক বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা।
রহস্য উদঘাটন ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের এডিএম আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
রোববার (৫ মার্চ) রাত ৯ টায় জেলা প্রশাসন সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান এর সভাপতিত্বে জরুরী সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়৷
অগ্নিকান্ডের পূর্বে আল ইয়াকিন ও আরসার সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ব্যাপক গুলি বর্ষণ করে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
যে কারণে ভীতসন্ত্রস্ত রোহিঙ্গারা বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে আসেন।
ফলে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড হওয়া সত্বেও অগ্নিদগ্ধ বা আহত হয়েছে এ ধরনের রোহিঙ্গা নারী -পুরুষ ও শিশুদের দেখা মিলেনি।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নাশকতামূলক ও রোহিঙ্গা বিদ্রোহী সংগঠন ‘আরসার’ ও আল ইয়াকিনের অর্ধশতাধিক সক্রিয় সদস্য এই অগ্নিকান্ড ঘটিয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, পালংখালী ইউপির চার নম্বর ওয়ার্ডের ১১ নম্বর ক্যাম্প সংলগ্ন স্থানীয় সুলতান আহমদের পুত্র আব্দু ছবিরসহ ২০-২৫ টি বসতবাড়িতে লুটপাট চালিয়েছে কতিপয় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা।
ইউপি চেয়ারম্যান আরো বলেন, আগুনে তিন হাজারের ওপরে রোহিঙ্গা বসতি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।শুধু তাই নয় স্থানীয়দের তিন শতাধিক দোকানও আগুনে পুড়ে যায়।
স্থানীয় রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকার ব্যবসায়ী ও একটি মার্কেটের মালিক আকবর আহমেদ জানান, আমি আগুন লাগার পূর্ব থেকে শেষ পর্যন্তই ঘটনাস্থলে ছিলাম। নিজের চোখে যা দেখেছি তা হলো, অনেক রোহিঙ্গা নিজেদের বাড়িতে নিজেরাই আগুন দিয়েছে। ক্ষতিপয় রোহিঙ্গা আরসা ও আল ইয়াকিনের সাথে মিশে গিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
তিনি আরো জানান, ক্যাম্প ১১, ১০ ও ১২ নম্বর ক্যাম্পের বিভিন্ন ব্লকে প্রায় চার হাজারের উপরে বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। যেখানে কয়েকটি মার্কেটের তিন শতাধিক দোকানও পুড়ে যায়।
বালুখালী ৯ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা আবুল কাশেম ও নুরুল আলম বলেন, পরিকল্পিতভাবে এই আগুন দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। আরসার সন্ত্রাসীরা এই অগ্নিকান্ডের সাথে জড়িত বলে আমাদের ধারণা।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান জানান, ঘটনার পরপরই জেলা প্রশাসনের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছেন। ক্ষয়ক্ষতি নিরুপনের জন্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন( এবিপিএন) এর অধিনায়ক এডিআইজি মো.আমির জাফর জানিয়েছেন, আগুনে ২ হাজারের অধিক ঘর পুড়ে যায় । এতে ১২ হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন। কিভাবে আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ক্যাম্পের ঘরগুলো পাশাপাশি হওয়ায় আগুন ১২, ১১, ১০ ও ৯ নম্বর ক্যাম্পে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের সূত্রপাত কি কারণে তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও সন্দেহজনক এক যুবককে আটক করেছে এপিবিএন ও পুলিশ। আটক যুবককে জিজ্ঞাসাবাদের পর বিস্তারিত জানা যাবে।
এবিষয়ে উখিয়া থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানান , ফায়ারসার্ভিসের ৯টি ইউনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এ পর্যন্ত ২ হাজারের অধিক ঘর পুড়ে গেছে বলে ধারণা করা হলেও তা নিশ্চিত করে বলতে সময় লাগবে। এ পর্যন্ত কোন হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ফায়ারসার্ভিস কক্সবাজার স্টেশনের উপ- সহকারী পরিচালক অতীশ চাকমা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে আগুনের সূত্রপাত ও ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি । তিনি বলেন, আগুনের সূত্রপাত ও ক্ষত-ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য নির্ধারণে কাজ চলছে। তা সঠিক জানাতে সময় লাগবে।
অতিরিক্ত শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা নয়ন জানান ,
প্রাথমিক অবস্থায় ২ হাজারের মত ঘর পুড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এ সংখ্যা বাড়তে পারে। আগুনের সময় হুড়োহুড়ি করে ছুটতে গিয়ে অর্ধশতাধিক নারী – পুরুষ ও শিশু আহত হন। গৃহহারা ২০ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন এনজিও অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্টানে। তাদের খাবারের দায়িত্ব নিয়েছেন ডব্লিউএফফি ও রেড় ক্রিসেন্ট।
রোববার (৫ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বালুখালীর ১১ নম্বর ক্যাম্পের বি ব্লকের একটি ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন মূহুর্তের মধ্যে ৯, ১০, ১২ নম্বর ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়ে।
আগুন সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এতে প্রায় চার হাজারের অধিক বসত ঘর আগুনে পুড়ে গেছে। ঘর হারিয়েছে ২০ হাজার মানুষ। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক।
প্রসঙ্গত, একই ক্যাম্পে ২০২১ সালের ২২ মার্চ ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা হয়ে ছিল। ওই সময় ১১ জনের মৃত্যু, ৫ শতাধিক আহত হয়। পুঁড়ে গিয়ে ছিল ৯ হাজারের বেশি ঘর।







